ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের তেলিয়ামুড়া এলাকায় খোয়াই নদীতে চাকমা ব্যারাজ দেয়ার ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের হুমকিতে পড়েছে গোটা হবিগঞ্জ জেলা। নদী পানিশূন্য হওয়ায় শুষ্ক মওসুমে এ এলাকার সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন,উজানে ও ব্যারাজের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহারের ফলে জেলার অভ্যন্তরে পাঁচটি ছোট-বড় নদী সেচ মওসুমের আগেই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। কৃষকেরা পানির অভাবে ফসল ফলাতে পারবেন কি না দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
অপরদিকে বর্ষা মওসুমে ব্যারাজ খুলে দেয়ার কারণে সৃষ্ট বন্যার ফলে কৃষকেরা ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। চাকমা ব্যারাজের বিরূপ প্রভাবে প্রতি বছরই কৃষকেরা তির সম্মুখীন হচ্ছেন।
ভারতের অবৈধ নদী নিয়ন্ত্রণের ফলে হবিগঞ্জ জেলার খোয়াই,করাঙ্গী,সুতাং, ধলাই,ইছালিয়া নদীসহ অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। পানির প্রাকৃতিক উৎস সঙ্কুচিত হওয়ার ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন,কৃষি,মানবস্বাস্থ্যসহ সার্বিক পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। শুষ্ক মওসুমে সার্বিক সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তারা।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের তেলিয়ামুড়া চাকমা ব্যারাজ এলাকা পরিদর্শন করেছেন এমন ব্যক্তি জানান,ভারতীয়রা আন্তর্জাতিক পানিবণ্টন আইন লঙ্ঘন করে চাকমা ব্যারাজ দিয়ে খোয়াই নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বন্ধ করে রেখেছেন। যতসামান্য পানি ছাড়লেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম।
জানা যায়,ত্রিপুরা রাজ্যের তেলিয়ামুড়া মহকুমা থেকে খোয়াই নদী বাল্লা সীমান্তের টেকেরঘাট নামক স্থান দিয়ে বাংলাদেশের চুনারুঘাট,শায়েস্তাগঞ্জ,হবিগঞ্জ,লাখাই হয়ে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে। খোয়াই নদীতে চাকমা ব্যারাজ দেয়ার ফলে ভাটিতে অসংখ্য খাল বিল এখনই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে।
হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের এক কর্মকর্তা জানান,জেলায় প্রায় দেড় হাজার সেচযন্ত্র রয়েছে। সেচকাজে কৃষকের আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় জেলায় সেচযন্ত্রের ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলেছে। এসব সেচযন্ত্র প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নদী খাল বিলের ওপর নির্ভরশীল। খোয়াই নদীর উৎসমুখে বাঁধ দেয়ার ফলে নদীকেন্দ্রিক সেচব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বিরূপ প্রভাবে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মওসুমে হাজার হাজার নলকূপে পানি না ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। চাকমা ব্যারাজের ফলে হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমির ফসল,পরিবেশ,কলকারখানা,আড়াই শ’ প্রজাতির মাছ ও নৌপথ এখন হুমকির মুখে।
খোয়াই নদীর গতিপথে ব্যারাজ নির্মাণ সম্পর্কে হবিগঞ্জের পরিবেশবাদী সাংবাদিক নুরুল আমীন জানান,খোয়াই নদীর গতিপথে বাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহে বাধার সৃষ্টি করার ফলে দিন দিন নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। এতে নদীতে মাছের বিচরণ নেই বললেই চলে। নদীতে চর জেগে ওঠা,নাব্যতা হ্রাস পেয়ে নৌচলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি,ঘন ঘন বাঁক সৃষ্টি,পানিপ্রবাহ হ্রাস,দূষণ বেড়ে যাওয়া, নদীকেন্দ্রিক সেচকাজ ব্যাহত হওয়া,অতিরিক্ত পলি জমার মতো বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে। চাকমা ব্যারাজের বিরূপ প্রভাব থেকে হবিগঞ্জের পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে এখনই পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংগঠনকে এগিয়ে আসা দরকার বলে তিনি মনে করেন।
চুনারুঘাট সীমান্তের আহম্মদাবাদ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আলহাজ আবেদ হাসনাত চৌধুরী সনজু বলেন,প্রায় ২০ বছর আগে চাকমা ব্যারাজ দিয়ে ভারতীয়রা খোয়াই নদীর স্বাভাবিক গতিরোধ করার ফলে এলাকার পরিবেশ বির্পযয় দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কৃষকেরা সেচকাজে নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। খোয়ই নদীতে বালু ও পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এখনই সরকার এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নিলে এ এলাকা বিরাণভূমিতে পরিণত হবে।