ঢাকা: এরশাদ! বর্তমান রাজনীতির ময়দানে সবচেয়ে আলোচিত নাম। নায়ক নাকী খলনায়ক? রাজনীতির মাঠে ঠিক কোন ভূমিকায় আছেন তা হয়তো তিনি নিজেই জানেন না। বয়স নব্বইয়ের কোঠায়। কিন্তু তাতে কী? রাজনীতির ময়দান রীতিমতো দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছেন বেশ দক্ষতার সঙ্গেই। জন্ম দিচ্ছেন নতুন নতুন ইস্যুর। রাজনীতির মাঠে মুহুর্তেই পাল্টে দিচ্ছেন আলোচনার মোড়।
নয় বছর দেশে স্বৈর শাসন চালানোর পর তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে যার পতন হলো, দেশের রাজনীতিতে তিনি কীভাবে এখনো টিকে আছেন? কীভাবে এখনো ক্ষমতার পালাবদলে এত জোরালো ভূমিকা রাখছেন? কীভাবেই বা ক্ষমতার অংশীদার হচ্ছেন? এমন হাজারো প্রশ্নের জবাব হয়তো অনেকেই খুঁজছেন।
কিন্তু এরশাদের অতীত ইতিহাস একটু ঘাটলেই এবং দেশে আদর্শবিহীন ক্ষমতা কুক্ষিগত করার যে রাজনীতির ধারা চলমান সেদিকে একটু সতর্ক দৃষ্টি ফেরালেই বিষয়টি একেবারে পানির মতো পরিস্কার হয়ে যাবে।
[b]কে এই এরশাদ? [/b]
আমি নিজে কোন আলোচনা না করে এরশাদ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো: মাইমূল আহসান খানের “সাংবিধানিক আইন; রাজনীতিতে ধর্ম ও স্বাধীনতা” বইয়ের ১৯৯৮ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত সংস্করনের ৪৩ পৃষ্ঠা থেকে কয়েকটি লাইন হুবহু তুলে ধরলাম:
“১৯৭১ সনে পাকিস্তানে আটকেপড়া সৈনিকদের একজন হয়ে কিভাবে শেখ মুজিবের আমলে হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের এত দ্রুত উন্নতি হয়, তা বোঝা মুশকিল। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সনে পাকিস্তানীরা বাঙালী সামরিক অফিসার ও সৈনিকদের বিচার করার জন্য যে সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে, তার (একমাত্র) বাঙালী সদস্য ছিলেন হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ। অর্থাৎ কোন বিবেচনাতেই তিনি বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে স্থান পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না। অথচ শেখ মুজিব সরকার তাকে স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে মর্যাদার সাথে স্থান করে দিলেন।”
এভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের এতবড় বিরোধী এবং পাকিস্তানের শীর্ষ দালালদের একজন হয়েও এরশাদ কোন জাদুর বলে বঙ্গবন্ধুর মন জয় করেছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে স্থান করে নিয়েছিলেন সে প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনদিনই জানা যাবে না।
[b]ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হলেন না এরশাদ:[/b]
পাকিস্তানি সেনা সদস্যদের মধ্যে ১৯৫ জন আসল যুদ্ধাপরাধী অর্থাৎ তদন্তে প্রমানিত মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বঙ্গবন্ধু স্ব সম্মানে ফেরত দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক সিমলা চুক্তির মধ্য দিয়ে। তাদের বিচারের সামর্থ শেখ হাসিনা সরকারের নেই। কিন্তু পাকিস্তানী সামরিক ট্রাইব্যুনালের একমাত্র বাঙ্গালি সদস্য যিনি এখনো বহাল তবিয়তে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন এবং দীর্ঘ নয় বছর দেশে স্বৈরশাসন চালিয়ে নুর হোসেনসহ বিপুল সংখ্যক নিরীহ মানুষ হত্যা করেছেন, সেই ভয়ংকর “পাক হানাদারকে” শেখ হাসিনা কেন বিচারের মুখোমুখি করলেন না? উল্টো তার সঙ্গে জোট করে সরকার গঠন করলেন।
এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, যুদ্ধাপরাধের বিচার আসলে কোন ইস্যু নয়, ক্ষমতার মসনদে বসাই আসল। আর সে কারণেই এরশাদকে শরীক হিসেবে নবম সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আরোহনের পর এবার দশম সংসদে এরশাদের জাতীয় পার্টিকে প্রধান বিরোধী দল সাজিয়ে আবারো ক্ষমতার মসনদে বসলেন শেখ হাসিনা। এমনকী ক্ষমতায় বসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আবারো বললেন সেই পুরোনো কথা অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বাকি কাজ সমাধা করতেই জনগণ তাকে আস্থায় নিয়ে পুনরায় নির্বাচিত করেছেন। এজন্য তিনি জনগণকে ধন্যবাদও জানান এবং ৪০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনের দেয়া বিতর্কিত ফলাফল ঘোষণায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
[b]এরশাদের ফাঁদে কুপোকাত জিয়া: [/b]
প্রশ্ন আসতে পারে, এরশাদের এভাবে বেড়ে উঠার পেছনে জিয়াউর রহমান কী কম দায়ী? ১৯৭৮ সালে জিয়ার আমলেই কী এরশাদকে চিফ অব আর্মি স্টাফ পদে এবং পরবর্তী বছরের ৭ই নভেম্বর লে: জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়নি? এসব প্রশ্নের জবাব খুবই সহজ। আর তা হলো জিয়া বা বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য কোন নির্বাচনী অঙ্গিকার করেননি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবেও আওয়ামী লীগের মতো ব্যবহার করেননি বা করছেন না।
আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়েই রাজনীতিতে অত্যন্ত সচেতন জিয়াকে পর্যন্ত বোকা বানিয়েছিলেন এরশাদ। নিজেকে ক্ষমতার মোহমুক্ত এবং কিছুটা রোমান্টিক স্বভাবের হিসেবেই জিয়ার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন এরশাদ। জিয়াও ভেবেছিলেন ক্ষমতার প্রতি এমন নির্মহ এবং স্বভাবে কিছুটা রোমান্টিক এরশাদই তার জন্য নিরাপদ। যাই হোক পরবর্তী ইতিহাস অনেকেরই জানা।
[b]এবারো সফল এরশাদ: [/b]
এবারো বেশ সফলতার সঙ্গেই ক্ষমতার অংশীদার না হলেও গৃহপালিত বিরোধী দলের কর্ণধার হিসেবে বাকি জীবনটা বেশ শান্তিতে কাটিয়ে দেয়ার পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করলেন এরশাদ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে।
১০ম সংসদ নির্বাচনের আগে ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেভাবে ধরাশায়ী হলেন, তাতে ১০ম সংসদ নির্বাচনে যদি বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত আসতো এবং নির্বাচনের মাঠে জীবন বাজি রেখে ভূমিকা রাখতে পারতো, তাহলে হয়তো বা ভিন্ন কিছু হলেও হতে পারতো। কিন্তু শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে না যেতে অনঢ় বিরোধী দলকে যখন বার বার হাসিনার পক্ষ থেকে নির্বাচনে আসার আহবান জানানো হচ্ছিল, ঠিক তখনই এরশাদ ঘোষণা দিলেন প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে না আসলে তিনি ও তার দল নির্বাচনে যাবেন না। এরশাদের এই ঘোষণার পর বিরোধী দলের নূণ্যতম নির্বাচনে অংশ নেয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা ভেস্তে যায়।
আর এই সুযোগে অনেকটা নাটকীয় কায়দায় গ্রেফতার, গ্রেফতার পরবর্তী সামরিক হাসপাতালে ভর্তি, সেখানে গলফ খেলে সময় কাটানো, দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, নিজে বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় নির্বাচিত হওয়া এবং সবশেষ নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে এরশাদের শপথ নেয়া-সবই যেন একই সূত্রে গাঁথা।
[b]সবই অনিশ্চিত: [/b]
যেভাবে একের পর এক নাটকীয় ঘটনা ঘটে চলেছে, তাতে এরপর যে কী ঘটবে তা হয়তো বোদ্ধামহলই ভালো বলতে পারবেন। দেশ-বিদেশে বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসীন বর্তমান সরকার কত দিন টিকবে? প্রধান বিরোধী দলের হয়ে ক্ষমতার স্বাদ এরশাদ কতটুকু ভোগ করতে পারবেন? জীবনের এই শেষ বেলায় একবারের জন্যও রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসার যে স্বপ্ন এরশাদ দেখছেন বলে যে গুজব অহরহ চাউর হচ্ছে রাজনীতির মাঠে তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে কতটুকু সম্ভব হবে? এমন বহুপ্রশ্নের উত্তর দেখার অপেক্ষায় আমার মতো দেশের কোটি কোটি মানুষ-এমনটাই আমার বিশ্বাস।
[b]লেখক: সাংবাদিক
email: [email protected][/b]
শ্রেণীহীন
স্বৈরাচার, রাজাকার কিছুই ঠেকাতে পারলো না এরশাদকে
এরশাদ! বর্তমান রাজনীতির ময়দানে সবচেয়ে আলোচিত নাম। নায়ক নাকী খলনায়ক? রাজনীতির মাঠে ঠিক কোন ভূমিকায় আছেন তা হয়তো তিনি নিজেই জানেন না। বয়স নব্বইয়ের কোঠায়। কিন্তু তাতে কী? রাজনীতির ময়দান রীতিমতো দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছেন বেশ দক্ষতার সঙ্গেই।





