মানিকগঞ্জের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা ও যমুনা ছাড়া বাকি চার নদী ধলেশ্বরী, পুরাতন ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা ও ইছামতি এখন মৃতপ্রায়। নদী এলাকার চারপাশের ফসলী জমিও বালুচরে পরিণত হয়েছে। এতে সেচ কাজসহ মানুষকে দৈনন্দিন  কাজে চরম দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
বর্ষা মওসুম ছাড়া এ নদীগুলো থাকে পানিশূন্য। নদীর বুকজুড়ে ধু-ধু বালুচর, কোথাও চাষাবাদ, কোথাও গরু চরানো কিংবা কিশোরদের ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার দৃশ্য চোখে পড়ে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র মতে, ১৩৭৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মানিকগঞ্জে এই চার নদীর দৈর্ঘ্য পরিসীমা ২৪১ কিলোমিটার। জেলার তরা, জাগীর, বেউথাঘাট ও জাফরগঞ্জ এলাকায় নদীবন্দর ছিল। এখান থেকে বড় বড় স্টিমার, লঞ্চ ও নৌকা চলাচল করত। এখন এসব কেবলই স্মৃতি। কালের বিবর্তনে মানিকগঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রবহমান চারটি নদীই এখন মৃতপ্রায়।
ধলেশ্বরী নদী ঘিওর উপজেলার জাবরা থেকে শুরু করে সাটুরিয়ার তিল্লী, বরাইদ হয়ে জাগিরের ভেতর দিয়ে সিঙ্গাইরের শেষ মাথা পর্যন্ত মিশেছে। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ কিলোমিটার। পুরাতন ধলেশ্বরী নদীটি দৌলতপুরের মূল যমুনা থেকে শুরু হয়ে ঘিওরের জাবরায় এসে শেষ হয়। এর দৈর্ঘ্য ২৬ কিলোমিটার। জাবরা থেকে শুরু হয়ে সিংগাইরের ধল্লা পর্যন্ত কালীগঙ্গা নদীর অবস্থান। যার দৈর্ঘ্য ৩৫ কিলোমিটার। শিবালয় থেকে শুরু করে উথুলী হয়ে হরিরামপুর পদ্মানদীর সাথে মিশেছে ইছামতি। এর দৈর্ঘ প্রায় ৯০ কিলোমিটার।
এ ছাড়া যমুনা দৌলতপুর থেকে পাটুরিয়াঘাট পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত রয়ে গেছে। তা ছাড়া পদ্মা নদী হরিরামপুরের পাঁচটি ইউনিয়নকে বেষ্টন করে রেখেছে। পদ্মা ও যমুনা ছাড়া সব নদীই এখন মৃতপ্রায়। দেখে বোঝার উপায় নেই বাকিগুলো একসময় গভীর নদী ছিল।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1398665803.jpg[/img]
জেলা থেকে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার মাধ্যম ছিল এই নদীপথ। কালের বিবর্তনে অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ এবং উজান থেকে চলে আসা পলিতে নদীগুলো ভরাট হয়ে চরাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। নদীগুলো খনন না করায় দেশীয় মাছ বিলুপ্তির পথে। ফলে মৎসজীবীরা বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নদী মরে যাওয়ায় কৃষিতে সেচকাজ দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কালীগঙ্গা নদী তীরবর্তী বেউথা ঘাট, ধলেশ্বরী নদীতে জাগীর ব্রিজসংলগ্ন ও জাফরগঞ্জ বাজার এক সময় ছিল জেলার সবচেয়ে বড় নদীবন্দর। এসব বন্দর থেকে বড় বড় স্টিমার, লঞ্চ ও  নৌকা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করত। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের তরাঘাটে কালীগঙ্গা নদীতে ফেরি সার্ভিস চালু ছিল।
জানা যায়, সর্বপ্রথম সড়ক পথে সবচেয়ে বড় সেতুটি ছিল ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কালীগঙ্গা নদীতে তরাঘাটের ওপর। পানি না থাকায় মানিকগঞ্জের সব নদীবন্দরের কার্যক্রম হারিয়ে ফেলেছে। এগুলো এখন কেবলি স্মৃতি। ধলেশ্বরী ও কালীগঙ্গা নদীর বুকজুড়ে এখন বোরো, মাষকলাই, তামাকসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ হচ্ছে। এক সময়ের তীব্র খোরস্রোতা কালীগঙ্গায় এখন চাষাবাদ, গোচরণ ও দুরন্তদের খেলাধুলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সাথে চলছে মাটি বালুর রমরমা ব্যবসা।
মানিকগঞ্জের সাংবাদিক সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু অনেকটা আক্ষেপ করেই জানালেন মানিকগঞ্জের নদীর ইতিকথা। নদীর এ করুণ মৃত্যুকে মাতৃশোকের সমতুল্য মনে করে তিনি বলেন, এখনো সময় আছে, নদীগুলোকে বাঁচানোর। যথাযথ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এসব নদী পুরোপুরি হারিয়ে গেলে তা হবে এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ও জীব বৈচিত্র্যের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা বলেন, নদী পুনঃখনন না করায় মৎস্য উৎপাদন, কৃষি ও পরিবেশবান্ধব নৌকার ব্যবহার ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরে নদী খনন কাজ বন্ধ রয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে গাজীখালী নদীতে কিছু খননের কাজ হয়েছে। এ ছাড়া নদী খননের জন্য জলবায়ু ট্রাস্ট ভাণ্ডের বরাবর একটি প্রকল্প দাখিল করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর মেলেনি।
মানিকগঞ্জ পরিবেশ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক শেখ মো: নাজমুল হুদা বলেন, মানিকগঞ্জে প্রবহমান নদীগুলো মৃতপ্রায় হওয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্যসহ সর্বত্রই এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ভরাট হওয়া নদীগুলো খননের জোর দাবী জানিয়েছেন জেলাবাসী।
[b]ঢাকা, ২৮ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেবি[/b]