সরাসরি অথবা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দলের বক্তব্য বা মতামত প্রচার না করার বিধান রেখে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার খসড়া প্রকাশ করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়।
নীতিমালাটি চূড়ান্ত হলে আলোচনা অনুষ্ঠানে অসংগতিপূর্ণ, বিভ্রান্তিমূলক বা অসত্য তথ্য দেওয়া যাবে না। এ ধরনের অনুষ্ঠানে উভয় পক্ষের যুক্তিগুলো যথাযথভাবে উপস্থাপনের সুযোগ রাখতে হবে।  
তবে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মতে, এই খসড়া নীতিমালায় এমন কিছু ধারা রয়েছে, যার মাধ্যমে আইনের অপপ্রয়োগ হতে পারে। এটি বেশি নিয়ন্ত্রণমূলক। এর ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও রয়েছে।
আইনজ্ঞ শাহদীন মালিকের মতে, এ ধরনের ধারার ফলে আইনের অপপ্রয়োগ হতে পারে। তিনি বলেন, কোনো বক্তব্য শুধু সত্য কিংবা মিথ্যা হওয়ার কারণে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার বিধান প্রায় দেড়শ বছর ধরে সব সভ্য দেশে আইনব্যবস্থা থেকে বিলোপ করা হয়েছে। আইনের অসীম প্রয়োগের কারণে এটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। নীতিমালায় এসব থাকলে আইনের অপপ্রয়োগই ফিরে আসবে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর ১৪ পৃষ্ঠার জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার খসড়া প্রকাশ করা হয়। সর্বসাধারণের মতামত নেয়ার জন্য ২১ দিন এটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে রাখা হবে।
সম্প্রচার নীতিমালার খসড়ার তৃতীয় অধ্যায়ে সংবাদ ও অনুষ্ঠান প্রকাশের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো আলোচনামূলক অনুষ্ঠানে কোনোপ্রকার অসঙ্গতিপূর্ণ বিভ্রান্তিমূলক অসত্য তথ্য বা উপাত্ত দেয়া পরিহার করতে হবে। এ ধরনের অনুষ্ঠানে উভয়পক্ষের যুক্তিগুলো যথাযথভাবে উপস্থাপনের সুযোগ থাকতে হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো বিদ্রোহ, নৈরাজ্য ও হিংসাত্মক ঘটনা ঘটলে তা সম্প্রচার করা যাবে না। এ ছাড়া আইন অমান্য করার পক্ষে সহানুভূতি সৃষ্টি করে এমন কিছু দেখানো যাবে না।
খসড়ায় বলা হয়েছে, নীতিমালার কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণের জন্য স্বাধীন সম্প্রচার কমিশন গঠন করা হবে। কমিশন অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন এবং সম্প্রচারের মান নির্ধারণ ও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।
সব বেসরকারি বেতার, টেলিভিশন, কমিউনিটি রেডিও, অনলাইন বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। সম্প্রচার কমিশন লাইসেন্স দেওয়ারও নীতিমালা তৈরি করবে।
তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে এরইমধ্যে অনুমোদন পাওয়া বেসরকারি বেতার ও টেলিভিশনগুলোকে ধারাবাহিকতা রেখে ওই নীতিমালার অধীনে লাইসেন্স নিতে হবে। এ সম্পর্কিত আইন, নীতি ও বিধিমালা তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকার তথা তথ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
সরকার অনুমোদিত বেশ কিছু অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলকভাবে প্রচার করার নিয়মও নীতিমালায় যুক্ত করা হয়েছে। সব ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের শর্ত দেওয়া হয়েছে এ নীতিমালায়।
এতে বলা হয়, বেতার বা টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের ভাষা, দৃশ্য বা নির্দেশনা কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক অনুভূতির প্রতি পীড়াদায়ক হবে না। মডেলদের পোশাক-পরিচ্ছদ হতে হবে শালীনতা ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্যের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ইত্যাদি স্থানের ধর্মীয় স্থিরচিত্র বা চলমান চিত্র প্রদর্শন করা যাবে না।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, গুঁড়া দুধের বিজ্ঞাপনে পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুদের মডেল হিসেবে বা তাদের ছবি ব্যবহার করা যাবে না। গুঁড়া দুধের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য ‘মায়ের দুধের বিকল্প নেই’, ‘এই গুঁড়া দুধ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য নয়’—এই বাক্য দুটি কমপক্ষে পাঁচ সেকেন্ড স্পষ্টাক্ষরে দেখাতে হবে।
টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে সশস্ত্র বাহিনী অথবা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত অন্য কোনো বাহিনীর প্রতি অশোভন কটাক্ষ, বিদ্রূপ বা অবমাননা করা যাবে না। বেতার বা টেলিভিশন চ্যানেলকে নিজ দায়িত্বে বিজ্ঞাপনসংক্রান্ত ছাড়পত্র নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন নীতিমালা সঠিকভাবে অনুসরণ করা না হলে সরকার সংশ্লিষ্ট টিভি বা বেতার চ্যানেলের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারবে।
মোট ১২ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না বলে নীতিমালায় শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বা ছাড়পত্র ছাড়া অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান, নাইট ক্লাব, বার, সিগারেট, বিড়ি, চুরুট, অন্যান্য মাদক প্রভৃতি। অ্যালকোহল মিশ্রিত এবং নেশাজাতীয় পণ্য(অ্যালকোহলের পরিমাণ যা-ই থাকুক না কেন), সরকারের অনুমোদনবিহীন আবাসিক ভবন বা স্থাপনা-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনও প্রচার করা যাবে না।
নীতিমালায় থাকা অনুষ্ঠানে সরাসরি বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দলের বক্তব্য বা মতামত প্রচার করা যাবে না। শীর্ষক ধারাটি শেষ পর্যন্ত বহাল থাকলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন `দৈনিক মানবজমিন`র সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী।
তিনি বলেন সরাসরি রাজনৈতিক দলের বক্তব্য প্রচার করা না গেলে তো আমাদের দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশও প্রচার করা যাবে না।
[b]ঢাকা, ২৬ জানুয়ারি (টাইম নিউজ বিডি.কম)//এএইচ[/b]