সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীন বলেছেন,“বাংলাদেশকে সত্যিকার গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনতে হলে অবিলম্বে একটি অর্ন্তবর্তীকালীন অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প পথ নেই। নির্বাচন ছাড়া এই একপক্ষীয় নির্বাচনের গুমোট কাটবে না। যেখানে জনগণের ম্যান্ডেটের প্রতিনিধি নেই, সরকার নেই সেখানে গণতন্ত্র থাকতে পারে না।”
বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমিতে ‘মুক্তিযুদ্ধ; স্বাধীনতা, মানবাধিকার: প্রেক্ষিক বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা ও গুনীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিচারপতি শিকদার মুকবুল হক।
‘জীবনের জন্য জীবন ফাউন্ডেশন’-এর আয়োজনে আলোচনা সভা শেষে দেশের তৃণমূল নেতৃত্ব তথা ইউনিয়ন পরিষদের গুনী সমাজসেবী চেয়ারম্যানদের হাতে ক্রেস্ট ও সম্মাননা স্মারক স্বীকৃতির সনদ তুলে দেয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, ১৫৩ জন যখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হয়ে গেলো, তখনই নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন বন্ধ করা।
বোঝা উচিত ছিল এই প্রক্রিয়া জনগণের ম্যান্ডেট বিহীন। যেখানে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সরাসরি সমর্থনবিহীন ম্যান্ডেট পাবেন তারা ক্ষমতায় গেলে জনগণের মুখাপেক্ষি হবেন না। যেখানে জনগণের ম্যান্ডেটের শাসন নেই সেখানে গণতন্ত্র বিপন্ন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল বড় দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু সেটা না করে নির্বাচন কমিশন ১৫৩ জনকে জনগণের ভোট ছাড়াই বিজয়ে সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রের তালিকায় অগণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিনি আরও বলেন, “ধর্ম ছাড়া পৃথিবীর কোনো জাতি অগ্রগতি লাভ করতে পারেনি। আমাদের দেশে একটি গোষ্ঠি কিংবা একটি অংশ ধর্মকে বস্তাবন্দি রেখে সব অনৈতিক কর্মকান্ডকে বৈধতা দিতে চায়। ধর্মকে যারা বিচ্যুত করে অন্য সব অপকর্মকে যায়েজ করতে চায় তারা সত্যিকার মানুষ কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ ধর্মই একমাত্র পারে মানুষকে নৈতিক শিক্ষা দিতে।”
তিনি এ প্রসঙ্গে উদাহরণ দিয়ে বলেন, “ভারতে সম্প্রতি ক্ষমতায় যাওয়ার মতো পরিস্থিতি যারা তৈরি করেছে তারা কট্টর ধর্মীয় অনুরাগী। শুধু তাই নয় ভারতে বিজেপি, শিবসেনা, আরএসএস-সহ এমন অনেক দল আছে যারা ধর্মকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে রাজনীতিতে টিকে আছে। সেখানে কিন্তু ভারত সরকার তাদের টুটি চেপে ধরার চেষ্টা করেনি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভারত সরকার বোঝে যে, ধর্মকে আঘাত দিয়ে কোনো অপকর্ম করা হলে তা জনগণ সহ্য করবে না।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে এর বিপরীত চিত্র। বাংলাদেশে ধর্মনির্ভর দলগুলোর সাথে সরকারের বৈরি সম্পর্ক। সরকার ধর্মের টুটি চেপে ধরার জন্য ধর্ম নির্ভর দলগুলোর উপর নিপীড়ন চালাচ্ছে।”
এই প্রক্রিয়া অগণতান্ত্রিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অগণতান্ত্রিক নয়, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের জন্যই বাংলাদেশের জন্ম।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মানবাধিকার কর্মী ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. মো. শাহজাহান আলী বলেন,‘বাংলাদেশে মন্ত্রী-এমপি’রা আলাদীনের এমন কি শিক্ষা পেয়েছেন যে রাতারাতি তারা আলাদীনের চ্যাড়াগ পেলো! ৫ বছর না যেতেই তাদের ৫ হাজার গুন পর্যন্ত সম্পদ বেড়ে যায় কিভাবে?’
তিনি বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড প্রসঙ্গে বলেন, “বাংলাদেশে বেওয়ারিশ লাশের মিছিল দিনকে দিন ভারী হচ্ছে। বাংলাদেশে চলছে ক্রসফায়ারের নামে গণহত্যা। যারা ক্রসফায়ারে নিহত হচ্ছেন তারা জানেন না কি তাদের অপরাধ। যদি তারা অপরাধীই হবে তার জন্য বিচার ব্যবস্থা আছে। সেখানে তাদের প্রমাণ সাপেক্ষে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।”
তিনি বলেন, “আইনের শাসনের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো ন্যায়ের শাসন। যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় সেখানে আইনের শাসন থাকতে পারে না। আর যেখানে আইনের শাসন নেই সেখানে ন্যায়ের শাসনও নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।”
মানবাধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন আর স্বাধীনতা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলাদেশে এর কোনোটিই নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্চে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে বিচারপতি শিকদার মুকবুল হক বলেন, “মুখের কথায় কখনো চিড়ে ভিজে না। আপনারা কথায় কথায় গণতন্ত্রের কথা বলবেন আর প্রতিদিন ক্রসফায়ারের নামে গণহত্যা চালাবেন তা মানা যায় না।” বাংলাদেশে প্রতিদিন ক্রসফায়ারের নামে গড়ে ৩/৪ জনকে হত্যা করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সব আদালত ও থানা গুলোতে অজ্ঞাতনামা আসামির নামে ব্যবসা ও হয়রানি চলছে। নামে আসামির চেয়ে বেনামের আসামির সংখ্যাই বেশি। এই প্রবণতা রোধ করা সম্ভব না হলে গণ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আর যারা গণ বিস্ফোরণ নির্মূলে পদক্ষেপ নিচ্ছে ইতিহাস সাক্ষি তারা নিজেরাই নির্মূল হয়ে গেছে।
অনুষ্ঠানে এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন, ‘জীবনের জন্য জীবন ফাউন্ডেশন’-এর চেয়ারম্যান শাহ আলম চুন্নু। বাংলাদেশের কনিষ্ট ও বিচারক জরিপে সর্বশ্রেষ্ট চেয়ারম্যান কাজী সবুজ, ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গোবিন্দ লাল চন্দ্র।
[b]ঢাকা, জেইউ, ৬ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর
[/b]