[b]ঢাকা: [/b]ফররুখ আহমেদকে মুসলিম রেঁনেসার কবি বলে চিহ্নিত করা হয়। কোন সন্দেহ নেই অধঃপতিত,উপেক্ষিত এবং অবহেলিত মুসলিমদের জাগাবার জন্য তিনি মসীযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
রেঁনেসা বলতে কি বুঝি, সুপ্রকাশ রায় তার ‘পরিভাষা কোষ’এ এভাবে সংজ্ঞা দিয়েছেন 'এই আন্দোলন কেবল সাহিত্য বা কলাশিল্প বা কোন বিশেষ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইহা জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে চিন্তা,সামাজিক,অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক, সাহিত্য,কলাশিল্প প্রভৃতির ক্ষেত্রে পরিব্যপ্ত হয়ে সভ্যতার এক নতুন স্তরে উন্নীত করে।
তবে নজরুল ইসলাম ও ফররুখ আহমদের মতে- 'প্রাচীনকে ধ্বংস না করে,সে ঐতিহ্য,সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে,পুরানা ঐতিহ্যের উপর ভিত্তির উপর নতুন আদর্শ সৃষ্টি করে,পুরনো ঐতিহ্যের সাথে নতুন ও পরিবর্তনশীল সামাজিক অবস্থার সামঞ্জস্য বিধান করা। ইসলামই বিশ্বে প্রথম রেঁনেসার উদগাতা।
কারণ বিজ্ঞানের অনেক মূল সূত্রের আবিস্কারের গৌরব মুসলিম বিজ্ঞানীদের। যদিও দুর্ভাগ্যক্রমে তাদের কার্যাবলীর বিষয়ে বিশেষ অজ্ঞতাবশত অনেক সময় বা বিদ্বেষবশত তাদের প্রাপ্য আসন তাদেরকে দেয়া হয়নি।
যুদ্ধবিদ্যায়, বন্দুক বা কামানের প্রযুক্তি সর্বপ্রথম ব্যবহার মুসলিমরাই করেন। যার উদাহরণ,ভারতের পানিপথের যুদ্ধে বাবরের বিজয়ী হওয়ার পেছনে ছিল গোলন্দাজ বাহিনী। ইতিহাস বলে,এই যুদ্ধে বাবর কামান ও অন্যান্য উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন।
বিজ্ঞানচর্চায় আত্মনিবেদিত মুসলিমরা মারাযার মানমন্দিরকে বিজ্ঞানসম্মত যন্ত্রপাতি দিয়ে সুসজ্জিত করেছিলেন।
মানচিত্র অংকন বিদ্যাতেও মুসলিমরা বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন।
গণিত,জ্যামিতি,পদার্থ বিদ্যা ও রসায়নের বিভিন্ন শাখায় মুসলিম বিজ্ঞানীরা অসামান্য আবিস্কার সাধন করেন।
আরব মুসলিমরা নৌ-বিদ্যায় ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। তাই বলা যায় মানব মুক্তি,মানব স্বাধীনতা মুক্তি,মানব চিন্তা নিপীড়ন মুক্তি যদি রেঁনেসার নামে অভিহিত হয় তবে ইসলামই সেই রেনেঁসার প্রথম উদ্ভাবক।
মধুসূদনের সাথে ফররুখের পার্থক্য হল,মধুসূদন ছিলেন সাহিত্য ও কাব্যে আত্মসমর্পিত। সেজন্য খ্রিষ্টান হয়েও হিন্দু সাহিত্যে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন নন। কিন্তু ফররুখ শুধু তার ধর্মের প্রতিই অনুরক্ত নন সেই ধর্মের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে তার শিল্প,সাহিত্য ও কাব্যের সঙ্গে অবিমিশ্র ভালবাসা সম্পৃক্ত। কাব্যকে ভালবাসতে গিয়ে তার ধর্মবন্ধন ছিন্ন করার প্রয়োজন হয়নি।
নজরুল একটি হিন্দু-মুসলিম এক বলয়ে রেখে একটি অসম্ভবকে সম্ভব করতে চেয়েছিলেন। ফররুখ ইকবালের মত ভেবেছিলেন এটি বাস্তবতঃ অসম্ভব। অতএব সময়ের ও বাস্তবতার দাবি মনে রেখ ফররুখ পাকিস্তান আন্দোলনকে স্বাগত জানান উপমহাদেশের সকল মুসলিম এর মত। জাগ্রত সেই অস্তিত্ব রায় মুসলীম স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা রূপায়িত হয়ে উঠেছিল ফররুখ কাব্যে। সে জন্য ফররুখকে মুসলিম রেঁনেসার কবি বলে চিহ্নিত করা অযৌক্তিক হবে না।
‘সাতসাগরের মাঝি’ কবিতায় ফররুখ যখন বলেন,‘কতনা আধার পর্দা পারায়ে ভোর হলো জানিনা তা’ তখন তার ভিতর থেকে শুধু একজন মানুষের নয় একটি জাতির হৃদয়ের কান্না বিচ্ছুরিত হতে থাকে। তখন সে কান্নার মধ্য দিয়ে কারবালার কান্না, বাগদাদ, স্পেন পতনের কান্না,পলাশী যুদ্ধের পরাজয়ের,সিপাহী বিপ্লবের বিফলতার,ফিলিস্তিনের অবুঝ শিশুদের উতথাল মিছিলের, কান্দাহারের মাটিতে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে পড়ে থাকা কালিমার পতাকার, কিংবা গুজরাটের মাটিতে ছাই হয়ে মিশে যাওয়া মুসলমানদের কান্না ঝরে পড়তে দেখা যায়।
ফররু যে সামান্য কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘ইকবাল প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধটি অন্যতম। তিনি তার মধ্যে ইকবাল প্রসঙ্গে বলেছেন, “নিখিল মানব সমাজের জন্য যে পুরুষ ও প্রকৃত মুসলিমের অভ্যূদয় ইকবালের মানসকে আমরা দেখেছি সেই পুরুষরূপে। সেই পুরুষের আদর্শেই ইকবাল গড়তে চেয়েছেন বর্তমান সমাজের প্রত্যেকটি মানুষকে।
মধুসূদনের ভাষায় ও ছন্দের কাসিক রীতি ফররুখকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু ধর্মচিন্তা,সংস্কৃতি চিন্তা ঐতিহ্য ও শিল্প চিন্তার ক্ষেত্রে ফররুখ মধুসূদনের গোত্রের কবি নন। ভারতীয় হিন্দুরা ভারতীয় মুসলমানদেরকে কখনও মার চোখে দেখেনি,মা করেনি এবং ভবিষ্যতেও মা করবে না। নজরুলের চিন্তাদর্শে যত মহত্বই থাকুক সে মহত্বের অনুসরণ করে মুসলমানদের স্বার্থ রা সম্পূর্ণ অসম্ভব ভেবেছিলেন ইকবাল ও ইকবাল শিষ্য ফররুখ।
বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ১৩৫০ সালের দুর্ভিক্ষে অন্তত ৫০ লাখ লোক মারা যায় কিন্তু বাংলা সাহিত্যের কোথাও তার যথাযথ চিত্র পাওয়া যায় না একমাত্র ফররুখ আহমেদের কবিতাগুলো ছাড়া। শিল্পী জয়নুল আবেদিন তার বিখ্যাত তুলিতে এই দূর্ভিক্ষের পরিনতির কিছু হৃদয়বিদারক কিছু ছবি,বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় তাঁর ‘অসনি সঙ্কেত’ উপন্যাসে এর করুণ কাহিনী,সত্যজিৎ রায়ের ছায়াছবিতে কিছু করুণ চিত্র এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কিছু কবিতায় এই দুর্ভিক্ষের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
শ্রেণীহীন
মুসলিম রেঁনেসার কবি ফররুখ আহমেদ
ঢাকা: ফররুখ আহমেদকে মুসলিম রেঁনেসার কবি বলে চিহ্নিত করা হয়। কোন সন্দেহ নেই অধঃপতিত,উপেক্ষিত এবং অবহেলিত মুসলিমদের জাগাবার জন্য তিনি মসীযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।





