রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসকরা বলতে গেলে রাতভর রীতিমতো নৈরাজ্যই চালালেন। রোগীর স্বজনের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক পেটানোর পর ইন্টার্ন চিকিৎসকরা হাসপাতালটিতে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন হাসপাতালের মধ্যম সারির চিকিৎসকরাও। এ অবস্থায় রবিবার রাত ১০টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় হাসপাতালটিতে ১১ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচজনের বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া গতকাল বিকেলে চিকিৎসক না আসায় অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছেন আরেক রোগী।
এদিকে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় গতকাল দুপুরে রাজশাহীতে কর্মরত সাংবাদিকরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন। সাংবাদিক নেতারা ঘটনায় জড়িত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতি দাবি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় রাতে নগরীর রাজপাড়া থানায় সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরো ১৫০ জনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। এক মামলার বাদী সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান রুবেল এবং অন্যটির বাদী আসাদুজ্জামান আসাদ। মামলায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, ক্যামেরা ছিনতাই ও ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাজপাড়া থানার ওসি খান মোহাম্মদ একরাম।
তবে বিনা চিকিৎসায় কোনো রোগী মারা যায়নি বলে দাবি করছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন।
এদিকে রামেক হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা গতকাল সন্ধ্যায়ও কাজে যোগ দেননি। সহকারী রেজিস্ট্রার চিকিৎসকরা অবশ্য দায়িত্বে ফিরেছেন। তবে সার্বিকভাবে হাসপাতালে চিকিৎসাব্যবস্থায় অচলাবস্থা চলছে।
রবিবার রাতে যা ঘটেছিল: নগরীর সাগরপাড়া এলাকার ইশরাইল হোসেনের ছেলে ও এসএসসি পরীক্ষার্থী আকাশ আলী (১৬) রবিবার রাত ৯টার দিকে বাড়িতে বসে লেখাপড়া করার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। দ্রুত রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিলে তাকে পাঠানো হয় ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে। ওই সময় দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কিছুক্ষণ পর ইন্টার্ন চিকিৎসক সুব্রত পাল রোগীর কাছে আসেন। ততক্ষণে আকাশের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আকাশের ভাই আক্তার হোসেন রোজ ওই ইন্টার্ন চিকিৎসককে থাপ্পড় মারেন। এরপর সুব্রত পাল ফোন করে তাঁর সহকর্মী অন্য ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ডেকে নেন। সেই সঙ্গে আসেন সহকারী রেজিস্ট্রার সিএ (মধ্যম সারি) চিকিৎসকরাও।
আকাশের মা আলেয়া বেগম জানান, ছোট ছেলের খারাপ অবস্থা দেখে বড় ছেলে বিচলিত হয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসককে চড় মারার পর মুহূর্তে গোটা ১৩ নম্বর ওয়ার্ড ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মধ্যম সারির চিকিৎসকে ভরে যায়। তাঁরা রোজকে ধরে হাসপাতালের বারান্দায় নিয়ে পেটাতে থাকেন। ছেলেকে উদ্ধারে এগিয়ে গেলে তাঁকেও চড়-থাপ্পড় মারেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। এ অবস্থায় গোটা হাসপাতালে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য মতে, রোজকে পেটানোর সময় ওই ওয়ার্ডের প্রধান গেটে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।
‘ধর, ধর’ বলে তেড়ে আসেন ইন্টার্নরা : আরেক রোগীর স্বজন হাবিবুর রহমান জানান, রোগী আকাশের ভাই রোজকে পেটানোর খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কয়েকজন সাংবাদিক ১৩ নম্বরে ওয়ার্ডে যান। এ সময় সাংবাদিকরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ‘ধর, ধর’ বলে তেড়ে আসতে থাকেন ইন্টার্ন ও সিএ চিকিৎসকরা। এ সময় আতঙ্কিত সাংবাদিকরা পেছনের দিকে পালানোর চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে যমুনা টেলিভিশনের ক্যামেরা পারসন রাসেল আহম্মেদ, চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের রিপোর্টার আবরার শাহরিয়ার, ক্যামেরা পারসন আবু রায়হান ও এটিএন নিউজের ক্যামেরা পারসন রুবেল হোসেনসহ আরো কয়েকজনকে ধরে পেটাতে থাকেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। তাঁদের এলোপাতাড়ি মারধরে অন্তত সাত সাংবাদিক আহত হন। তাঁদের মধ্যে গুরুতর আহত রাসেলকে রাতেই ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আর রায়হান নগরীর একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া ইন্টার্ন চিকিৎসকরা সাংবাদিকদের চারটি ক্যামেরা ভাঙচুর করেন। এর মধ্যে কালের কণ্ঠের ফটো সাংবাদিক সালাউদ্দিনের ক্যামেরাও ভেঙে ফেলা হয়।
রাতভর নৈরাজ্য: হাসপাতালের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, লাঞ্ছিত হওয়ার প্রতিবাদে রোগীর স্বজনকে বেধড়ক মারধর এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েই থেমে থাকেননি ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন মধ্যম সারির সহকারী রেজিস্ট্রার ও সিএ চিকিৎসকরা। তাঁরা দফায় দফায় জড়ো হয়ে হাসপাতালজুড়ে ব্যাপক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। এতে হাসপাতালজুড়ে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
১২ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসা এক শিশুর বাবা হাফিজুর রহমান বলেন, চিকিৎসকরা সাংবাদিকদের ওপর হামলার পরও প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে হাসপাতালে ছোটাছুটি, চিৎকার-চেঁচামেচি করতে থাকেন। ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজন হাফিজুর রহমান জানান, ওই চিকিৎসকরা কখনো কখনো পরিচালকসহ অন্য চিকিৎসকদের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা চালান। রাত ১টার দিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা দল বেঁধে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। এরপর শুরু হয় চিকিৎসায় নৈরাজ্য।
পাঁচজনের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু : হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টারের কার্যালয় সূত্র মতে, রবিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ওই ঘটনার পর থেকে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় ১১ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে বিনা চিকিৎসায়। ইন্টার্ন চিকিৎসকনির্ভর হাসপাতালে রাতে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ধর্মঘটে থাকায় ভেঙে পড়ে হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা। আবার প্রতিটি ওয়ার্ডে রাতে একজন করে সহকারী রেজিস্ট্রার চিকিৎসক থাকলেও ওই ঘটনার পর থেকে তাঁদের অধিকাংশই ইন্টার্নদের সঙ্গে কর্মবিরতিতে যোগ দেন। এ অবস্থায় বিনা চিকিৎসায় ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে দুজন এবং ৮, ১০ ও ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে একজন করে রোগী মারা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের রোগী নাসির উদ্দিন (৭৫) ও সোলায়মান আলীর (৪০) স্বজনরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
নাসির উদ্দিনের স্বজন ইলিয়াস আলী জানান, মাথার সমস্যার কারণে নাসির উদ্দিনকে গত শনিবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর পর থেকে তিনি ২ নম্বর ওয়ার্ডে নিউরো মেডিসিন বিভাগে ভর্তি ছিলেন। কিন্তু রবিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে তার অবস্থা হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়। ওই সময় ওয়ার্ডে কোনো চিকিৎসক ছিলেন না। তিনজন নার্স মিলে সেবা দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা চালালেও নাসির উদ্দিনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
একই অভিযোগ করে সোলায়মানের স্বজনরাও।
অক্সিজেনের অভাবে আরেক রোগীর মৃত্যু, ভাঙচুর : এদিকে গতকাল অক্সিজেন দেওয়ার চিকিৎসক না পেয়ে আরেক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনার পর রোগীর স্বজনরা হাসপাতালে ভাঙচুর চালায়। এ নিয়ে কর্মচারীদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়া ওই রোগীর নাম শহিদুল ইসলাম (৪৫)। তাঁর বাড়ি নগরীর চণ্ডীপুরে। তিনি রাজশাহী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মচারী ছিলেন। তাঁর ছেলে নাহিদুল অভিযোগ করেন, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তাঁর বাবাকে রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়। সে সময় তিনি শ্বাস নিতে পারছিলেন না। অক্সিজেন দিতে বললে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, জরুরি বিভাগে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এরপর দ্রুত তাঁকে ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে নেওয়া হয়। সেখানে নার্সরা রোগীকে দ্রুত অক্সিজেন দিতে হবে বলে ডাক্তারকে ডাকতে যান। কিন্তু ডাক্তারদের কক্ষটি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। নার্সরা অনেক ডাকাডাকি করলেও দরজা খোলা হয়নি। এর প্রায় আধঘণ্টা পর শহিদুল মারা যান।
[b]ঢাকা, ২৩ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম)// এনএস[/b]