রাত্রি হলো ভোর।/ আজি মোর/ জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী/ প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি/ হাতে করে আনি/ দ্বারে আসি দিল ডাক/...উদয় দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে।/ মোর চিত্ত-মাঝে/ চির নূতনেরে দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।
বাঙালি জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান পুরুষ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জম্মদিন আজ। বাঙালির মনন,সংস্কৃতি আর চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশীদার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৩ তম জন্মজয়ন্তী সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা আয়োজনে বরণ করে নেওয়া হবে।
রবীন্দ্রনাথের লেখা,দর্শন,চিন্তাচেতনা,তথা বহুমাত্রিক আলোকছটার ঔজ্জ্বল্যে ও মহিমায় বাঙালীর জাতিসত্তা হয়েছে মহিমান্বিত ও গৌরবান্বিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর সাহিত্য।
তিনি একাধারে কবি,ঔপন্যাসিক,সংগীতস্রষ্টা,নাট্যকার,চিত্রকর,ছোটগল্পকার,প্রাবন্ধিক, অভিনেতা,কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। যার মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশ্ব দরবারে পরিচিতি ও গুরুত্ব লাভ করে। বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলায় সাহিত্যচর্চার যে প্রধান ধারা,সেখানে তাকেই অনুসরণ করা হয়। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় লেখালেখি ছাড়াও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে ভাষার ব্যবহারে। সাহিত্যের ভাষা হিসেবে চলিত ভাষার ব্যবহারকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন। সে সূত্রে বলা যায়,ভাষার ক্ষেত্রে বর্তমানে যে ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চোখে পড়ে তার প্রধান অনুপ্রেরণা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বাংলা গদ্যের সনাতনী ও আধুনিক ধারার মধ্যে যুগসন্ধি। সে দিক থেকে তার গুরুত্ব উত্তরোত্তর বাড়ছে।
বিশ্বকবির ভাষাতেই বলতে হয়,'দিকে দিকে নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস/শান্তির ললিত বাণী শুনাইবে ব্যর্থ পরিহাস'। তবু দৃঢ় প্রত্যয়ে কঠিন-কঠোর বাস্তবতার নৃশংসতায় চূর্ণ প্রান্তরে দাঁড়িয়েই আমাদের বলতে হবে,'মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।'এই আশাবাদী প্রত্যয় নিয়েই জাতি স্মরণ করবে আজ আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। কবির সেই আত্মপ্রত্যয়ের প্রতিধ্বনি করেই বলতে হবে_'ওই মহামানব আসে।/দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে/মর্তধূলির ঘাসে ঘাসে...'।
[b]আমাদের রবীন্দ্রনাথ[/b]
বাঙালির চিন্তায়,চেতনায়,মননে---এক কথায় সমগ্র সত্তাজুড়েই রবীন্দ্রনাথ প্রবলভাবে বিরাজমান।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালের ৭ মে এবং বাংলা ১২৬৮ সালের ২৫ বৈশাখ (১৮৬১ সালের ৭ মে, বাংলা বর্ষপঞ্জি পরিবর্তনে এখন বাংলাদেশে ৮ মে) তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের (অধুনা পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের পরিবারটি ছিল একাধারে ধনাঢ্য ও সংস্কৃতিবান। তাদের বংশগতভাবে তারা ছিলেন আসলে  পিরালী ব্রাহ্মণ । পরে তাদের নামের সঙ্গে ``ঠাকুর`` কথাটি যুক্ত হয়। কবিগুরুর ছদ্মনাম ভানুসিংহ ঠাকুর। কৈশোরকালে তিনি এই ছদ্মনামে লিখতেন। তখনকার লেখা কবিতা 'ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি' নামে ছাপা হয়।
বাল্যকালে স্কুলের প্রথাগত শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেননি। গৃহশিক্ষক রেখে বাড়িতেই বিভিন্ন বিষয়ে তার শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এমনকি শরীরচর্চা ও মল্লক্রীড়াও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৮৭৪ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’তে তার ‘অভিলাষ’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশিত রচনা।
১৮৭৮ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার ইংল্যান্ডে যান। ১৮৮৩ সালে মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তার শশুরবাড়ি খুলনার দক্ষিণডিহিতে।
১৮৯০ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের শিলাইদহের জমিদারি এস্টেটে বসবাস শুরু করেন। ১৯০১ সালে পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানেই পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন।
১৯০২ সালে তার স্ত্রী মৃণালিনী মারা যান। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন কবি। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের  জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সেই উপাধি প্রত্যাখ্যান করেন কবি।
১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে মাত্র পাঁচজন ছাত্র নিয়ে তিনি বোলপুরে প্রতিষ্ঠা করেন তার স্বপ্নের শিক্ষাঙ্গন ‘শান্তি নিকেতন’।১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য তিনি শ্রীনিকেতন নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বভারতী।  দীর্ঘ জীবনে তিনি বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং সমগ্র বিশ্বে বিশ্বভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করেন।
তার সম্পাদনায় ভারতী, সাধনা, বঙ্গদর্শন প্রভৃতি পত্রিকা বের হয়। ‘ছবি ও গান’, ‘কড়ি ও কোমল’, ‘মানসী’, ‘রাজা ও রাণী’, ‘সোনার তরী’ ‘বলাকা’, ‘গীতবিতান’, ‘নৈবেদ্য’, ‘গীতাঞ্জলি’ তার কাব্য। ‘শেষের কবিতা’, ‘গোরা’, ‘চার অধ্যায়’, ‘চতুরঙ্গ’ তার রচিত উপন্যাস। ‘ছিন্নপত্র’ তার অবিস্মরণীয় পত্রসাহিত্য।
বাহান্ন বছর বয়সে ১৯১৩ সালের ১০ নভেম্বর সুইডিশ একাডেমি তাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে।  তিনি তার গীতাঞ্জলি কাব্যের জন্য বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে সম্মানজনক পদক নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।
নওগাঁর পতিসরে নিজের জমিদারির গরিব প্রজাদের নামমাত্র সুদে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে তিনিই প্রথম গ্রামীণব্যাংকের প্রতিষ্ঠা করেন। কুষ্টিয়ার শিলাইদহ ও পাবনার শাহজাদপুরে তার জমিদারিতে প্রজাদের কল্যাণের স্বার্থে আরও অনেক জনহিতকর কাজ করেছেন রবীন্দ্রনাথ।বহুবার প্রজাদের খাজনা মওকুফ করে নিজে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। নিজের অর্থে প্রজাদের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করেছেন।
৮০ বছর বয়সে ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ কলকাতার, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন তার জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। তার সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্র ও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত। এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের কাব্যসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য ভাবগভীরতা,গীতিধর্মিতা,চিুত্ররূপময়তা, আধ্যাত্মচেতনা,ঐতিহ্যপ্রীতি,প্রকৃতিপ্রেম,মানবপ্রেম,স্বদেশপ্রেম,বিশ্বপ্রেম,রোম্যান্টিক সৌন্দর্যচেতনা,ভাব,ভাষা,ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য,বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনা।
বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতাও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
[b]রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী[/b]
কবির অমলিন স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট তার বাণীতে বলেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সমাজ সংস্কারক। শিল্প-সাহিত্যের পাশাপাশি শিক্ষা সংগঠন, স্বদেশের মুক্তি আন্দোলন, শান্তির পক্ষে অবস্থান গ্রহণসহ বাংলার গ্রামীণ জনগণের কল্যাণে কৃষিব্যাংক ও সমবায় উদ্যোগ তাকে পরিণত করেছে মাটির কাছাকাছি এক চিরকালীন মানবহিতৈষী হিসেবে। রবীন্দ্রনাথের বিশালতা এবং তার সৃষ্টির অপূর্ব মাধুর্যকে অন্তরাত্মা দিয়ে উপলব্ধি করতে হলে রবীন্দ্রচর্চার বিকল্প নেই।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, বিশ্বসাহিত্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ২৪ বছরের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের লেখনী আমাদের উজ্জীবিত করেছে। তার জাতীয়তাবোধ বাঙালির অনন্ত প্রেরণার উৎস। আমাদের মননে বিশ্বকবির ব্যঞ্জনাময় উপস্থিতি শোষণ, বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িকতা ও অমানবিকতা প্রতিরোধে বাঙালির অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখবে।
[b]বিভিন্ন সংগঠনের অনুষ্ঠানমালা:[/b] বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে কবির স্মৃতিধন্য শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ও দক্ষিণডিহিতে পালিত হচ্ছে সরকারি আয়োজনে নানা অনুষ্ঠান। রাজধানীতে সরকারি পর্যায় ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করবে। সকাল ১১টায় রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানমালা উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
[b]বাংলা একাডেমী:[/b] একক বক্তৃতা, রবীন্দ্র-পুরস্কার প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বিকেলে একাডেমীর প্রেস ভবনস্থ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সভাগৃহে 'একবিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ' শীর্ষক একক বক্তৃতা প্রদান করবেন কথাশিল্পী অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী।
রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার শওকত ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে তিন দিনের জাতীয় রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসবের আয়োজন করেছে। উদ্বোধন করবেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।
[b]ছায়ানট:[/b] বৃহস্পতিবার থেকে আয়োজন করেছে দু'দিনের রবীন্দ্র-উৎসব। চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানবতাবিরোধী অপশক্তি ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদ জানানো হবে উৎসবের নানা পরিবেশনায়। এবারের উৎসব সহযোগী গ্রামীণফোন ও স্কয়ার গ্রুপ।
সঙ্গীত,পাঠ ও আবৃত্তিতে অংশ নেবেন ৬০ জন শিল্পী। পরিবেশিত হবে পাঁচটি দলীয় নৃত্য। সব মিলিয়ে দু'দিনের উৎসবে নানা পরিবেশনায় অংশ নেবেন প্রায় ২০০ শিল্পী। শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের উৎসব শুরু হবে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়।
তাছাড়া আজ বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় ছায়ানটের শিল্পীদের গানের অ্যালবাম 'রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে'-এর মোড়ক উন্মোচন করবেন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী।
[b]চ্যানেল আইয়ের রবীন্দ্রমেলা শুক্রবার: [/b]অষ্টমবারের মতো চ্যানেল আই আয়োজিত রবীন্দ্রমেলা আজ বুধবার দিনব্যাপী হওয়ার কথা থাকলেও হরতালের কারণে তা ১০ মে অনুষ্ঠিত হবে। শুক্রবার সকালে পায়রা উড়িয়ে রবীন্দ্রমেলার উদ্বোধন করা হবে।
[b]ঢাকা, ৮ মে (টাইমনিউজবিডি.কম)// এনএস[/b]