রাজধানীর মিরপুর-১০ নাম্বারের আবাসন ব্যবসায়ী আবু তৈয়বের বড় ছেলে কামরুজ্জামান সুমন হত্যার মূল আসামীরা রয়ে গেছে পুলিশের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। পল্লবী থানার হাত ঘুরে সুমন হত্যা মামলার তদন্ত ভার এখন মহানগর ডিবি পুলিশের হাতে। হত্যাকাণ্ডের ৩ মাস অতিবাহিত হলেও মামলার তদন্তে অগ্রগতি আনতে পারেনি ডিবি পুলিশ। হত্যাকারীরা পুলিশের নাগালের বাইরে থেকে উল্টো হুমকি দিয়ে যাচ্ছে নিহতের পরিবারকে।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসী মিরপুরের শাহাদাত হোসেনের লোক পরিচয়ে হত্যকারীরা নিহতের ভাই রাজন ও পিতা আবু তৈয়বকে অনবরত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে মামলা তুলে নেয়ার জন্য। যদি মামলা তুলে না নেয়া হয় তবে তাদেরকেও একই পরিণতি বরণ করতে হবে বলেও হুমকি দেয়া হচ্ছে। খুনিদের বার বার হুমকিতে ভয়ে এখন পরিবারের সদস্যরা ফেরারি জীবন যাপন করছেন। নির্দিষ্ট কোনো স্থানে থাকতে পারছেন না তারা।
নিহত কামরুজ্জামান সুমনের পিতা আবু তৈয়ব পারিবারিকভাবে আবাসন ব্যবসার সাথে জড়িত। মিরপুর-১১ এর প্যারিস রোডে নিজস্ব জমিতে ৯ তলাবিশিষ্ট পাশাপাশি ৩ ফ্লাটের একটি বড় ভবন নির্মাণ করছিলেন তিনি।
এরই সূত্র ধরে সন্ত্রাসীরা তাঁর কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। ৫ লাখ টাকা দেয়ার পর বাকি টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। দাবিকৃত চাঁদার বাকি টাকা না দেয়ায় গত বছরের ৬ ডিসেম্বর শুক্রবার রাত ৮টার ২০ মিনিটে সুমনকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
এ ঘটনায় পল্লবী থানায় ৪ জনের নাম উল্লেখ করে নিহতের পিতা আবু তৈয়ব একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য পল্লবী থানা মামলার তদন্তভার মহানগর ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পরিবার নিয়ে আবাসন ব্যবসায়ী আবু তৈয়ব মিরপুরের-১০ এর ০৫ নাম্বার রোডের (ঢাকা ব্যাংকের বিপরীতে) একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।
সোমবার ওই বাসায় পরিবারটি সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হলে বাসার দারোয়ান আব্দুল বারেক জানান, সুমন হত্যাকাণ্ডের পরও এক মাস তারা এই বাসায় ছিলেন। কিন্তু অনবরত হুমকি-ধামকির কারণে তারা বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে তারা এই মুহূর্তে কোথায় আছেন তা তিনি জানেন না।
তিনি জানান, ‘মিরপুর-১১ এ প্যারিস রোডে যেখানে সুমনকে হত্যা করা হয়েছে সেখানে তৈয়ব ভাইয়ের একটা এপার্টমেন্ট আছে। সেখানে গেলে কাউকে হয়তো পেতে পারেন।’
দারোয়ান আব্দুল বারেকের কথা মতো, সেখানে গেলে ৯ তলা বিশিষ্ট নির্মাণাধীন ভবনের তদারকির দায়িত্বে থাকা আজহার আলী নামে এক কর্মচারীর সাথে কথা হয়। তিনি জানান, মাস খানেক হলো এখানে আসেন না সুমনের বাবা আবু তৈয়ব। সুমন যেখানে নিহত হয়েছেন, সেখানে তিনি আসলেই বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তাই পরিবারের সদস্যরা তাকে এখানে আসতে দেন না বলে জানান তিনি।
কর্মচারী আজহারের সাথে কথা বলতে বলতে সেখানে হাজির হন নিহত সুমনের ছোট ভাই রাজন। সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনি জানান, এখানে বেশিক্ষণ বসা ঠিক হবে না। আমরা বাইরে কোথাও গিয়ে বসি। পরে একটি স্থানীয় হোটেলে বসে কথা হয় রাজনের সাথে।
রাজন জানান, সুমন ভাই বেঁচে থাকতে আমি পড়াশুনা করতাম। এইচএসসি পাশ করে প্রাইভেট ইউনির্ভাসিটিতে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু এখন পড়াশুনা করতে পারছি না। সুমন ভাইয়ের অবর্তমানে পারিবারিক সব কিছুই আমাকে দেখাশুনা করতে হচ্ছে। সব চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে হুমকি-ধামকি দিয়ে যাচ্ছে হত্যাকারীরা।
তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের পর পল্লবী থানায় সোহাগ, শাহিন, নাহিদ ও মহসিনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলা দায়েরের পরের দিন সোহাগকে স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। এরপর আরিফ নামে আরো একজনকে আটক করে পুলিশ। তবে মামলার ইজাহারে উল্লিখিত বাকি তিনজনকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
তিনি জানান, মিরপুর এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের লোক পরিচয় দিয়ে প্রতিদিন মোবাইল ফোনে হুমকি-ধামকি দেয় হচ্ছে।
মামলার আসামী মহসিন ভারতে আছে দাবি করে রাজন বলেন, মহসিন ভারত থেকে ৯১৮৩৩৫৯০১৪৫৮ নাম্বার থেকে মোবাইল ফোনে কল দিয়ে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নাম্বা্র থেকেো কল দিয়ে হুমকি দিচ্ছে। একইভাবে আরও কয়েকজন আরব আমিরাত থেকে হুমকি দিচ্ছে সন্ত্রানী শাহাদাতের ভাই পরিচয় দিয়ে।
রাজনের মোবাইল ফোন নাম্বার থেকে কথা হয় পিতা আবু তৈয়বের সাথে। তিনি জানান, আমি প্রত্যাশা করেছিলাম ছেলে হত্যার বিচার পাবো। কিন্তু পুলিশ অপারগ হয়ে ডিবির কাছে তদন্ত ভার ন্যাস্ত করেছে। দায়িত্ব পাবার পর গোয়েন্দা পুলিশ(ডিবি) যে গতিতে তদন্ত কাজ করছে তাতে সন্দেহ হচ্ছে আদৌ ছেলে হত্যার বিচার পাবো কিনা।
তিনি বলেন, ছেলে হত্যার বিচার কি পাবো! এখন তো নিজেরাই ফেরারি। কোনো স্থানে বেশিদিন থাকতে পারছি না। লোকজন এসে চিরকুট পাঠিয়ে বাড়ি ছাড়ার হুমকি দিচ্ছে। এ কারণেই বাসা পরিবর্তন করেছি। এখন কোথায় আছি তাও নিরাপত্তার স্বার্থে বলতে পারছি না।
এ ব্যাপারে পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) সৈয়দ জিয়াউজ্জামান জানান, মামলার তদন্তভার এখন ডিবি’র হাতে। হত্যাকাণ্ডের পর আমরা সোহাগ নামে একজনকে আটক করতে সমর্থ হই। পরে সোহাগকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যার দায় স্বীকার করে এবং এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে নির্দেশদাতা হিসেবে মোক্তার, মহসিন এবং সাহাদাতের নাম উল্লেখ করে সোহাগ।
পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদে সোহাগ জানায়, আবাসন ব্যবসায়ী আবু তৈয়বের কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করা হলে ৫ লাখ টাকা দেয়। পরে বাকি ৪৫ লাখ টাকা চাইলে তিনি তা দিতে অপারগতার কথা জানান। এরই সূত্র ধরে মোবাইল ফোনে একাধিকবার হত্যার হুমকি দেয়া হয় বলেও স্বীকার করে সোহাগ।
সোহাগ পুলিশকে আরও জানায়, এরপরেও টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হত্যাকাণ্ডের কিছু দিন পূর্বে মিরপুর-১০ এ আবু তৈয়বকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। সে পর্বে বেঁচে যান তিনি।
কিন্তু শেষমেষ টাকা না পেয়ে ৬ ডিসেম্বর রাতে নির্মাণাধীন ভবনের ভিতরেই গুলি করে হত্যা করা হয় সুমনকে।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, মোক্তার ও মহসিন মিরপুর এলাকার পুরোনো আন্ডারগ্রাউন্ড কিলার। জনসম্মুখে তাদের ফেইস অপরিচিত হলেও আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকেই খুনের মন্ত্রনাদাতা ও মদদদাতা হিসেবে কাজ করেন।
কয়েক বছর আগে মিরপুর ১১ নাম্বারে মোক্তার-মহসিন কিলার গ্রুপের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে খুন এক লবন ব্যবসায়ী। পরে চাঁন নামে স্থানীয় এক সন্ত্রাসীর মাধ্যমে ওই লবন ব্যবসায়ীর ছেলেকেও হত্যা করেন তারা। এরপর কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে মোক্তার টিকে গেলেও মহসিন ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
এরপর মিরপুর এলাকায় মহসিনের অনুপস্থিতিতে মোক্তার হয়ে উঠেন আন্ডারগ্রাউন্ড কিলার গ্রুপের নেতা। কিছু দিন আগেও মিরপুর এলাকার আরেক আবাসন ব্যবসায়ী মোহাম্মাদ জাফরুল হক মুক্তার হত্যাকাণ্ডের সাথেও জড়িত হিসেবে পুলিশের তদন্তে হত্যাকারীর লিস্টে কিলার গ্রুপের মোক্তার ও মহসিনের নাম উঠে আসে।
সুমন হত্যাকাণ্ডের বর্তমান গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা লতিফ টাইম নিউজবিডি’কে জানান, দায়েরকৃত মামলায় তদন্ত করে জানা গেছে হত্যাকাণ্ডে ইজাহারভুক্তদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সোহাগ হত্যার ব্যাপারে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তদন্তে মোক্তার, মহসিন, সাহাদাত একই আন্ডারগ্রাউন্ডের কিলার বলে জানা গেছে। তারা সবাই একই গ্রুপে কাজ করে। বিভিন্ন খুন, চাঁদাবাজির মামলায় পলাতক আসামী তারা।
তিনি জানান, এই তিন জনই দেশের বাইরে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। ভারত থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন তারা। সুমন হত্যায় মোট আরও ৪ জনকে গ্রেফতার করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে না গ্রেফতারকৃতদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। শীগগিরই মামলার চার্জশীট দাখিল করা হবে বলে জানান তিনি।
[b]ঢাকা, জেইউ, ১১ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেবি[/b]
শ্রেণীহীন
খুনিদের হুমকিতে নিহতের পরিবারই ফেরারি
ঢাকা: রাজধানীর মিরপুর-১০ নাম্বারের আবাসন ব্যবসায়ী আবু তৈয়বের বড় ছেলে কামরুজ্জামান সুমন হত্যার মূল আসামীরা রয়ে গেছে পুলিশের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। পল্লবী থানার হাত ঘুরে সুমন হত্যা মামলার তদন্ত ভার এখন মহানগর ডিবি পুলিশের হাতে।





