আইন রয়েছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও রয়েছে। তারপরও আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে দেশে তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার। সম্প্রতি ‘ক্যাম্পেইন ফর ক্লিন এয়ার’ নামের একটি জরিপ প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দেশে ধূমপায়ীর হার ৪১ শতাংশের স্থলে বর্তমানে বেড়ে দাড়িয়েছে ৪৮ শতাংশে। এদিকে সম্প্রতি, তামাকজাত পণ্য নিয়ন্ত্রণে বিড়ি-সিগারেটসহ সব ধরণের তামাক পণ্যের উপর ৭০ শতাংশ করারোপের প্রস্তাব দিয়েছেন ৪০ জন সংসদ সদস্য। সচেতনতার অভাব ও প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় প্রতিনিয়ত ধূমপায়ীর সংখ্যা বাড়ছে বলে ধারণা করছে তামাক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1401520118.jpg[/img]
আজ ৩১ মে, বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। ১৯৮৭ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা তামাকের ব্যবহার কমানোকে উৎসাহিত করার জন্য বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৭৮টি দেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এ দিবসটি পালন করা হবে। এ বছরে দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে ‘তামাকের উপর কর বাড়াও, রোগ মৃত্যুর হার কমাও’।
বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার ২০০৪ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে মারা যায় ৫৭ হাজার মানুষ,পঙ্গুত্ব বরণ করেন আরও ৩ লাখ ৮২ হাজার মানুষ। বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের সম্পাদক এডভোকেট মাহবুব আলম মনে করেন বর্তমানে তামাক জনিত রোগে মৃতের সংখ্যা এক লাখেরও বেশি হবে। তিনি বলেন, ২০০৪ সালে যখন এই সমীক্ষাটি করা হয় তখন দেশে ধুমপায়ীর সংখ্যা ছিল ৩৭ ভাগ্ । বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৪৩ ভাগ । বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত তার একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন তামাক জনিত রোগের চিকিৎসার জন্য বছরে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যায় হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্য অনুসারে বিশ্বের প্রায় ষাট লাখ মারা যায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপানের কারণে। তামাক ব্যবহারকারী ও ধূমপায়ীদের মধ্যে ৮০ শতাংশ বাস করেন নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। এর পরও বিশ্বজুড়ে ধূমপান ও তামাক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। তবে উচ্চ ও উচ্চ-মধ্য আয়ের কয়েকটি দেশে তামাক ব্যবহারের পরিমাণ কমেছে। জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে তামাকজনিত কারণে প্রতিবছর মারা যাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বেসরকারি সংস্থা ‘আধূনিক’ তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন আলোচনা সভা ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
শক্তিশালী আইন করার মাধ্যমে তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে আগামী ৩ জুন শুরু হওয়া জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০৫ এর সংশোধনী পাশ করা হোক-এবারের বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসে এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।
সূত্র মতে, অতি প্রাচীন কাল হতে বাংলাদেশে তামাকে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ধূমপানের পাশাপাশি পানের সহিত জর্দা, সাদা পাতা ও গুল ব্যবহার করে। ধুমপানের মাধ্যম হিসেবে মানুষের কাছে হুক্কা এক সময় বেশ জনপ্রিয় ছিল। রাজা-বাদশা থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক-মজুর সকলের মধ্যে এর ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হতো। এখন হুক্কার পরিবর্তে বিড়ি-সিগারেটের প্রচলন হয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হতে ধুমপানকে খারাপ নজরে দেখলেও পান, গুল, জর্দাকে তেমন ভাবা হয় না।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1401519933.jpg[/img]
বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মতে, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ধূমপায়ীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমান বিশ্বে ধূমপায়ীর সংখ্যা ১শ কোটিরও উপরে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০১৫ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ১৬০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে এবং এই সময়ের মধ্যে তামাক ব্যবহার জনিত কারণে মৃত্যু ঘটবে ৫ কোটি লোকের। গ্লোবাল এডাল্ট সার্ভের মতে, বাংলাদেশে ১৫ বছরের উর্দ্ধে বয়স্ক জনগোষ্ঠির ২৩%(৪৪.৭% পুরুষ ও ১.৫% মহিলা) ধূমপান করে। দেশে বর্তমান ধূমপায়ীর সংখ্যা ২ কোটি ১৯ লাখ। যার মধ্যে ২ কোটি ১২ লাখ পুরুষ, ৭ লাখ মহিলা। ধূমপায়ীদের মধ্যে ২৩.৬% এর বসবাস গ্রামে এবং ২১.৩% শহরের বাসিন্দা। ধূমপায়ীদের মধ্যে অর্ধেক ধূমপানের মাধ্যম হিসেবে বিড়ি ব্যবহার করে। দেশে বর্তমান ২ কোটি ৫৯ লাখ লোক ধোয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করে থাকে। জরিপে দেখা যায়, ধূমপায়ীরা প্রতিদিন গড়ে ৫টা সিগারেট বা ৭টা বিড়ি ধূমপানের জন্য ক্রয় করে।
স্বাস্থ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকে ধূমপান একটি নিরব ঘাতক। যা অজান্তে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। প্রতিটি সিগারেট মানুষের জীবন থেকে কেড়ে নিচ্ছে মূল্যবান ১১টি মিনিট।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে ধূমপান জনিত রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৫৭ হাজার। প্রতিটি জলন্ত সিগারেট একটি কেমিক্যাল ফ্যাক্টরী। যা হতে প্রায় ৬ হাজার ক্ষতিকর বস্তু বের হয়। যেমন, এ্যামোনিয়া, কার্বন মনোঅক্সাইড, নিকোটিন, নাইট্রিক এসিড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, পারদ, আলকাতরা, নিকেল, সিসা, ক্যাডমিয়াম, বেনজিন ও কার্বনিল অন্যতম। মানুষ সাধারণত যে সকল বস্তু গ্রহণ করে তার মধ্যে সিগারেট একমাত্র বস্তু যার কোন উপকারিতা বা পুষ্টি গুণাগুন নাই। ধুমপানের কারণে যে সমস্ত রোগ হয়ে থাকে তার মধ্যে অন্যতম কার্ডিও ভ্যাসকুলার ডিজিজ, ক্যান্সার, হাঁপানী, ব্রঙ্কাইটিস, পুরুষত্বহীনতা, স্ট্রোক অন্যতম।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1401520020.jpg[/img]
ধূমপান শুধু স্বাস্থ্যগত নয় অর্থনৈতিক দিক থেকেও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ হলে ১৮.৭% চাকুরী বৃদ্ধি পাবে। অপর গবেষণা দেখা যায়, প্রতি বছর বিড়ির পিছনে ২৯১২ কোটি টাকা খরচ হয়। যা দিয়ে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান হতে পারে। ইউনিসেফের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিদিন অপুষ্টির অভিশাপে ৫ বছরের কম বয়সী ৭শ শিশু মারা যায়। যার ৩৫০জনকে বাঁচানো সম্ভব হতো যদি তামাদের পিছনে যে অর্থ ব্যয় হয় তার ৬৯% খাবারের জন্য ব্যয় করা যেত। এছাড়াও প্রতি বছর বাংলাদেশে তামাক সেবনের ফলে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা বাবদ বছরে ব্যয় হয় ৯৯০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে তামাক খাতে সরকারের বার্ষিক আয় প্রায় ২৫০০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তামাকের কারণে দেশের অর্থনীতিতে বছরে নীট ক্ষতির পরিমাণ ৭৪০০ কোটি টাকা। ২০০৭ এর তথ্যানুযায়ী তামাক খাতে বার্ষিক আমদানী ব্যয় ১৫০ কোটি টাকা এবং রপ্তানী আয় ৯৮ কোটি টাকা।
তামাক পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ। প্রতি কেজি তামাক পোড়াতে ৫ কেজি জ্বালানী কাঠ লাগে। এ অনুযায়ী ১ একর তামাক পাতা পোড়াতে ৫ টন জ্বালানী কাঠ প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশে ১৯৯৯ সালে তামাক বিরোধী কার্যক্রমের গোড়া পত্তন হয় এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মীদের আন্দোলন অব্যাহত থাকার ফলশ্র“তিতে সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে ২০০৩ সালের ১৬ জুন এফসিটিসি'তে স্বাক্ষর করে এবং ২০০৪ সালের ১০ মে এফসিটিসি রেটিফাই ও ২০০৫ সালে ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫ নামে একটি আইন করে। আইনটির যথাযথ ব্যবহার ও দুর্বলতার কারণে গত কয়েক বছরে দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে তেমন কোন অগ্রগতি না হওয়ায় তামাক নিয়ন্ত্রণ সংগঠনগুলি প্রচলিত আইনটি যথাপযোগী করতে “আইনের শুধুমাত্র ধুমপানের বিষয় নয়, অন্যান্য তামাকজাত দ্রব্যকে অন্তর্ভূক্ত, তামাকজাত দ্রব্যের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সকল ধরণের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ, প্যাকেটের গায়ে ৫০ শতাংশ জায়গা জুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী, পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধুমপান করার ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫শ টাকা জরিমানা, আইন ভঙ্গ করলে কোম্পানীকে নুন্যতম ৫লাখ টাকা জরিমানা, আইনে শিল্প, কল-কারখানা, হোটেল, রেঁস্তোরাসহ সকল জনবহুল স্থানকে পাবলিক প্লেস এবং জনযানকে পাবলিক পরিবহনের আওতায় আনা। তামাক চাষ সম্পর্কে নীতিমালা, ১৮ বছরের কম বয়সীদের নিকট তামাক জাত দ্রব্য বিক্রয় নিষিদ্ধ, বৃক্ষ ও পরিবেশ সংরক্ষণে তামাক জাল ঘরে জ্বালানী কাঠ নিষিদ্ধ, শিশু ও নারীদের তামাকজাত দ্রব্য প্রক্রিয়াকরণ কাজে নিয়োজিত না করা।
বিড়ি শ্রমিকের বিকল্প কর্মসংস্থান ব্যবস্থা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠ্য পুস্তকে তামাকের কুফল তুলে ধরাসহ বিভিন্ন সুপারিশ সহকারে আইনটি সংশোধনের দাবী জানায়। এর প্রেক্ষিতে মন্ত্রীসভা ইতোপূর্বে সংশোধনীর খসড়া অনুমোদন করে এবং আগামী জাতীয় সংসদ অধিবেশনে আইনটি পাশের সমর্থন জানিয়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ সংগঠনগুলি জাতীয় সংসদ সদস্যদেরকে পত্র প্রদান করে। অধিবেশনে সংশোধনীটি পাশ হোক এমনটাই প্রত্যাশা করেছেন তামাক নিয়ন্ত্রণ সংগঠন সিয়ামের নির্বাহী পরিচালক মাসুম বিল্লাহ।
[b]ঢাকা, ৩১ মে(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস[/b]