শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের সিসি টিভি ক্যামেরা মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কনস্টেবল মো. বাদল মিয়া (২৬) হত্যাকাণ্ডের এক বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার চার্জশীট দাখিল করতে পারেনি পুলিশ।
তবে মামলার তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দাবি, বাদল হত্যার মোটিভ তারা ধরতে পেরেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশ ইন্সপেক্টর আবুল খায়ের মাতুব্বর জানিয়েছেন, পূর্বশত্রুতার জের ধরে কনস্টেবল বাদল মিয়াকে (২৬) খুন করা হয়েছে। দায়ের করা মামলার তদন্ত কাজ শেষপ্রান্তে। মোট ৪ জনকে আটক করা হয়েছে। একজন আসামী পলাতক। তাকে গ্রেফতার করতে পারলেই মামলার চার্জশীট দাখিল করা হবে।
বাদল হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কথা বলতে গেলে নিহতের বড় ভাই শহীদুল ইসলাম, স্ত্রী রুমা ইয়াসমিন ও ডিবি পুলিশের বক্তব্যে গরমিল পাওয়া গেছে।
শনিবার নিহত পুলিশ কনস্টেবল মো. বাদল মিয়ার বড় ভাই শহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, বাদল হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা এনামুল ওরফে খোকন রয়েছেন পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এনামুল বাদলের ভায়রা (স্ত্রী রুমার দুলাভাই)।
তিনি বলেন, 'বাদলের স্ত্রী রুমা ইয়াসমিনের ওপর এনামুলের ছিল লোলুপ দৃষ্টি। সে দৃষ্টিই কাল হয়েছে বাদলের জন্য।'
তিনি আরও বলেন, স্ত্রীর মৃত্যু পর শ্যালিকা রুমাকে বিয়ে করার জন্য উঠে পড়ে লাগে এনামুল। কিন্তু কনস্টেবল বাদলের কারণে তা বাধাগ্রস্থ হয়। তাই শ্যালিকা রুমাকে বিয়ের পথ প্রশস্ত করতেই রুমার খালাতো ভাই রাজিবের যোগসাজশে ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে বাদলকে খুন করে এনামুল।
তিনি বলেন, রুমার দুলাভাই এনামুল ও খালাতো ভাই রাজিবকে গ্রেফতার করতে পারলে বাদল হত্যার মূল রহস্য উদঘাটিত হবে। এই দু'জনের ব্যাপারে একাধিকবার অধিযোগ করা স্বত্ত্বেও তদন্ত কর্মকর্তা কোনো কর্ণপাত করেননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
শহিদুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের রাতে রুমা জানতো বাদলকে হত্যা করা হবে। সেই রাতে রুমা রাত সোয়া ১১টার পর বাদলের মোবাইলফোনে একাধিকবার কল দিয়েছিল। তাছাড়া লাশও উদ্ধার হয়েছে এনামুলের বাড়ির সামনে।
তবে নিহত পুলিশ কনস্টেবল বাদল মিয়ার স্ত্রী রুমা ইয়াসমিনের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি টাইমনিউজবিডি'কে বলেন, 'আমার জানা মতে বাদলের কোনো শত্রু নেই। আমরা প্রেম করে বিয়ে করেছি। বাদলকে কে বা কারা খুন করেছে সে সম্পর্কে আন্দাজ করে কিছু বলতে পারবো না।'
ডিবি পুলিশ মামলার তদন্ত কাজ করছে, ৩ জনকে গ্রেফতারও করেছে উল্লেখ করে রুমা ইয়াসমিন বলেন, 'হত্যাকারী যেই হোক না কেন আমাকে যারা বিধবা করেছে, আমার সন্তানকে যারা পিতৃহারা করেছে তাদের যেন ফাঁসি দেয়া হয়। আমি হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি।'
দুলাভাই এনামুল ও খালাতো ভাই রাজিবের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কিছু লোক আমার স্বামী বাদল হত্যার সাথে দুলাভাই ও খালাতো ভাইয়ের নাম অপপ্রচারের চেষ্টা করছে।'
মতিঝিল থানা ও গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে পরের দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত বাদল মিয়াকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রজন্ম চত্বরে দায়িত্বে এসে তিনি রাতের খাবার খান। রাত পৌনে ১১টার দিকে তার একটি মোবাইল ফোন আসে। এরপর তিনি নিখোঁজ হন।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে মতিঝিলের এজিবি কলোনির বটতলা এলাকা থেকে বাদলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, নিহত বাদলের চোখে আঘাতের চিহ্ন ছিল। সারা শরীরে অন্তরীণ আঘাত। তবে মৃত্যু নিশ্চিত করতে বাদলকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় মতিঝিল থানার তৎকালীন সাব-ইন্সপেক্টর আবদুল লতিফ বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের নামে মতিঝিল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তখন মামলাটি তদন্ত করেন থানার এসআই আউয়াল।
তবে দায়ের করা মামলায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় মামলার তদন্ত দায়িত্ব ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে অর্পিত হয়। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কাজ করছেন গোয়েন্দা পুলিশ ইন্সপেক্টর আবুল খায়ের মাতুব্বর।
তিনি টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, 'পুলিশ কনস্টেবল বাদল হত্যার মোটিভ আবিষ্কার হয়েছে। তদন্ত কাজও শেষের দিকে। শত্রুতার জের ধরে খুন করা হয়েছে বাদলকে। তিনি বলেন, 'বাদল হত্যার ঘটনায় বিশ্বজিত বিশু (৩৩), রিপন চন্দ ঘোষ (৩০), রতন চন্দ্র দাস (২৮), ইবরাহিম খলিল ওরফে কসাই খলিল (৩৮) নামে ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা সবাই বাদল হত্যাকান্ডের কথা স্বীকারও করেছে।
তিনি আরও বলেন, '২০০৯ সালে বিশ্বজিত বিশু ২টি অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল। এ ঘটনায় আদালত বিশুর ১৭ বছরের সাজা দেয়। কিন্তু সে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। মতিঝিলের এজিবি কলোনির হিন্দু পল্লীতে পাশাপাশি এলাকায় বসবাস করতো বাদল আর বিশু। এ কারণে পূর্ব থেকেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
গোয়েন্দা পুলিশ ইন্সপেক্টর আবুল খায়ের মাতুব্বর বলেন, 'অস্ত্রসহ আটক হওয়ার পেছনে বাদলের হাত ছিল বলে মনে করে বিশু। বিশুর ধারণা কনস্টেবল বাদল ইনফরমার হিসেবে কাজ করে অস্ত্রসহ তাঁকে পুলিশকে ধরিয়ে দিতে সহযোগিতা করেছে। এরপর থেকে বিশু বাদলকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকে।
মামলার ৪ আসামীকে গ্রেফতার এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করার পরেও কেন মামলার চার্জশীট দাখিল করা হচ্ছে না জানতে চাইলে এ তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, একজন আসামী পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেফতারের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। গ্রেফতার করা সম্ভব হলেই মামলার চার্জশীট দাখিল করা হবে।
তবে পলাতক আসামীর নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে ওই পলাতক আসামীর নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
বাদলের বড় ভাই শহীদুল ইসলামের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, লিখিতভাবে আমাদের কাছে অভিযোগ করা হলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দেখা হবে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে নিহত কনস্টেবল বাদলের স্ত্রীকে ৫ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। শিগগিরই মামলার চার্জশীট দাখিল করা হবে বলে জানান তিনি।
গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের সিসি টিভি ক্যামেরার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন পুলিশ কনস্টেবল মো. বাদল মিয়া (কনস্টেবল নম্বর ২৪২৫০)। কিন্তু পরের দিন মতিঝিল এজিবি কলোনির কাঁচাবাজার থেকে তার লাশ উদ্ধার করে মতিঝিল থানা পুলিশ। তখন পুলিশের সন্দেহ ছিল বাদল মিয়াকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
নিহত বাদলের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া থানার ফুলঝড়ি গ্রামে। বাবার নাম আবদুল আজিজ। বাদল মিয়া ঢাকার মাদারটেক দক্ষিণগাঁও বাজার এলাকায় আবুল হোসেনের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। জেসান নামে তার ২ বছরের একটি ছেলে রয়েছে।
[b]ঢাকা, জেইউ, ১০ মে (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেএইচ
[/b]