[b]ঢাকা:[/b] তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই স্মার্ট গার্মেন্টসে আগুন লাগে। জানুয়ারিতে এ ঘটনায় সাতজন পোশাকশ্রমিকের লাশের বোঝা কাঁধে নিয়েই পোশাকশিল্পের ২০১৩ সালের যাত্রা শুরু হয়। তবে সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেয় রানা প্লাজা ধস।
এপ্রিলের ওই ভবনধসের ঘটনায় এক হাজার ১৩৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু শিল্পটিকে খাদের কিনারে নিয়ে যায়। আর বহির্বিশ্বে দারুণভাবে ‘ইমেজ’ সংকটের মুখে পড়ে যায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক। এখানেই শেষ নয়, সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়ের এই খাতের ক্ষত আরও দীর্ঘ করে আমেরিকার বাজারে জিএসপি-সুবিধা স্থগিতের সিদ্ধান্ত, বছরের শেষার্ধে প্রকট হয়ে ওঠা রাজনৈতিক অস্থিরতা-সহিংসতা আর সব শেষে স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টসে নাশকতা।
এত সব ঘটনার পাকে পড়ে দেশের পোশাকশিল্প সারা বছরই দুঃস্বপ্নের মতো ছিল। কারণ একের পর এক দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের অন্তিম শবযাত্রা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। স্বজনের কান্নায় ভারী হয়েছে আকাশ-বাতাস। তাই শেষ পর্যন্ত দুঃস্বপ্ন নয়, শিল্পটির জন্য ‘কলঙ্কিত অধ্যায়’ হয়েই থাকল গেল বছর।
এসব ঘটনায় বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) তাৎক্ষণিকভাবে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে তা বাস্তবায়ন না করায় নানাভাবে সমালোচিত হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের লোকজনও পিছিয়ে নেই। যেমন, ডিসেম্বরের মধ্যে ২০০ কারখানা পরিদর্শক নিয়োগ করার কথা থাকলেও সেটি শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।
পোশাক কারখানার মালিকদের মতে, ৩০ বছরের জীবদ্দশায় এমন দুর্যোগের মুখে আগে কখনো পড়েনি শিল্পটি। তিলে তিলে গড়ে ওঠা পোশাকশিল্প আজ সত্যিই সংকটে। নতুন বছরের শুরুতেই আবার যোগ হচ্ছে শ্রমিকদের নতুন মজুরি। তা ছাড়া, এ বছরই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জিএসপি পুনর্মূল্যায়ন করবে। ফলে সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জই অপেক্ষা করছে।
মৃত্যু বনাম পোশাক খাত
রানা প্লাজা ধস, স্মার্ট গার্মেন্টস, তুংহাই ও আসওয়াতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট এক হাজার ১৫৮ জন পোশাকশ্রমিক মারা যান। এ ছাড়া, রানা প্লাজার ঘটনায় এখনো নিখোঁজ আছেন দুই শতাধিক শ্রমিক। দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্ঘটনা কিংবা অস্বাভাবিক মৃত্যু এককভাবে পোশাকশিল্পের মৃত্যুর ওই বিরাট সংখ্যাকে অতিক্রম করতে পারেনি।
অবশ্য এত শ্রমিকের জীবনের বিনিময়েও কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা এখন পর্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে। বলার মতো ক্ষতিপূরণ পাননি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা। এমনকি একটিও ঘটনার বিচার হয়নি, কারও শাস্তি হয়নি। যদিও স্মার্ট ও রানা প্লাজার কারখানার মালিকেরা কারাগারে আছেন। অন্যদিকে তাজরীনের মালিকের বিরুদ্ধে গতকাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।
সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সেপ্টেম্বরে বেশ কিছুদিন কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতায় নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি পণ্য পাঠাতে সমস্যায় পড়েন কারখানার মালিকেরা। এতে সময়মতো পণ্য না পেয়ে ক্রেতাদের আস্থার জায়গাটি নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে চলতি জানুয়ারি থেকে ইইউর বাজারে জিএসপি-সুবিধা পাচ্ছে পাকিস্তান।
মালিকদের দাবি, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির কারণেও বাংলাদেশ সক্ষমতায় খানিকটা পিছিয়ে যাবে। ইতিমধ্যে ক্রেতারা ২০ শতাংশ ক্রয়াদেশ দেওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। আর এসব ক্রয়াদেশ চলে যাচ্ছে প্রতিযোগী কয়েকটি দেশে।
তবু আশার আলো…
এত কিছুর পরও কিন্তু সব শেষ হয়ে যায়নি। রানা প্লাজার পর বিদেশে যখন বাংলাদেশের রক্তমাখা পোশাক না কেনার আন্দোলন শুরু হয়, তখন ক্রেতারা এগিয়ে আসেন। ইউরোপের ক্রেতারা অ্যাকার্ড ও আমেরিকার ক্রেতারা অ্যালায়েন্স জোট গঠন করেছেন। জোট দুটি দেশের সব পোশাক কারখানা পরিদর্শন করে কর্মপরিবেশের উন্নতি ঘটাবে।
এ ছাড়া রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় চার কোটি ডলারের একটি তহবিল গঠন করেছে আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক সংগঠন। স্পেনের এল করতে ইংলেস, যুক্তরাজ্যের বোনমার্চে, কানাডার লোবলো এবং ডাবলিনভিত্তিক প্রাইমার্ক এই তহবিলে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে কম মজুরি পান বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকেরা। এই অপবাদ কিছুটা হলেও ঘুচেছে। শ্রমিকদের দাবির মুখে সরকার শিল্পটির জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। তারপর সর্বনিম্ন মজুরি পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা কারখানাগুলো শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে পোশাকশিল্প পল্লি গঠনের কাজ ধীরে হলেও শুরু হয়েছে।
আর সবচেয়ে ইতিবাচক, নানা শঙ্কার মাঝেও পোশাক রপ্তানি বেড়ে চলেছে। চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস অর্থাৎ জুলাই-নভেম্বরে ৯৬৫ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২০ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি।
একাধিক উদ্যোক্তা জানান, রানা প্লাজা ধসের পর কিছু সংস্কারের মধ্য দিয়ে শিল্পটি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতায় সেটি বাধাগ্রস্ত হয়। নতুন বছরে অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব, যদি রাজনীতির ময়দান স্থিতিশীল থাকে। অন্যথায় অন্য যা কিছুই করা হোক না কেন, তা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতোই হবে। কথাটি কি শুনছেন রাজনীতিবিদেরা?
[b]টাইমনিউজবিডি/এসএমআর [/b]