অবশেষে কক্সবাজারের উপকুলীয় দ্বীপ মহেশখালীর সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দরের নির্মাণে সাড়া দিয়েছে ডেনর্মাক সরকার। ২০১১ সালে বন্দর নিমার্ণ কাজ আরম্ভ হয়ে তা ২০৫৫ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা রয়েছে।
সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ২০১৬ সাল নাগাদ প্রথম পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়। প্রথম পর্যায়ের নির্মাণ কাজ শেষ করতে প্রায় ১৬ হাজার কোটি ব্যয় ধরা হয়েছে।
২০৩৫ সাল নাগাদ দ্বিতীয় পর্যায়ের এবং আগামী ২০৫৫ সাল নাগাদ নির্মাণ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করতে সময় লাগবে ৪৩ বছর। সরকারের আহবানের প্রেক্ষিতে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের বিষয়টি তুলে ধরতে চায় দেশটি। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উত্তরের অপেক্ষা করছে বলে জানা গেছে।
তবে কোন দেশের আর্থিক সহযোগিতায় এটি তৈরি করা হবে সে বিষয়ে দ্রুত কোন সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে না সরকার। কেননা এ প্রকল্পটি যেহেতু বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগবে। তাই বিশেষ বিশেষ কিছু দিক বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রকল্পটির ধারাবাহিকতা যাতে বজায় থাকে সে জন্য সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, গত বছরের শেষদিকে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ডেনমার্কের কাছে অর্থায়নের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চায়। এ প্রেক্ষিতে ডেনমার্ক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে তারা আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে। যে কোন সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমন্ত্রণ জানানো হলেই তাদের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করবে এবং প্রস্তাবের বিষয়ে বিস্তারিত উপস্থাপন করবে। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এখনও ডেনমার্ককে কোন কিছু জানানো হয়নি বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ফার্স্ট ট্র্যাক মনিটরিং কমিটির বৈঠকে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে। ওই বৈঠকে শুধু পদ্মা সেতু নির্মাণকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
এখন পর্যন্ত ডেনমার্ক ছাড়া যে সব দেশ কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বড় ধরনের বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে এগুলো হলো- যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি।
সূত্র জানায়, এ সরকারের আমলে ৪৩ বছর মেয়াদী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে মোট ৫৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রণয়নের কাজ শুরু করা হয়। তিন পর্যায়ে এ বন্দর নির্মাণের কাজ শেষ করার লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট ‘গভীর সমুদ্রবন্দর সেল’ নামের একটি সেলেরও উদ্বোধন করা হয়।
এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব শেখ ওয়াহিদ উজ জামানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি অন্যদের মধ্যে রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, ইআরডি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্ব (পিপিপি) কার্যালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ সীমানায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচায়ের কাছ শুরু হয়। ২০০৬ সালের জুন মাসে জাপানে কনসালট্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল (পিসিআই কোম্পানী প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করেন। এর পর কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকার পর পুনরায় ২০০৭ সালের মে মাসে থেকে ২য় পর্যায়ে আবার কাজ শুরু করেন।
পিসিআইকে গভীর সমুন্দ্র বন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ১৪ কোটি টাকায় নিয়োগ দেয়া হয়। জাপানে কনসালট্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল বঙ্গোপসাগরের ৮টি স্থানকে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় নেয়। তাহলো কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, হিরন পয়েন্ট, পতেঙ্গা, আকরাম পয়েন্ট, মহেশখালী চ্যানেল সহ ৮টি স্থান। এরমধ্যে সোনাদিয়াকে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের উপযুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে।
পিসিআই মহেশখালীর সোনাদিয়া এলাকায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো দিক এবং সর্বোপরি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প হিসেবে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো যাচাই করে। চীন, ভারত ও মিয়ানমার অঞ্চলের বিভিন্ন বন্দর থেকে সম্ভাব্য গভীর সমুদ্র বন্দরের দূরত্ব, যাতায়াতে কত সময়ের প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে পণ্য পরিবহন সাশ্রয়ী কি না তা যাচাই করা হয়।
পিসিআইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের টেকনিক্যাল টিমের সদস্যরা সকল বিষয় যাচাইয়ের জন্য ভারত, নেপাল, চীন ও মিয়ানমার সফর করেন। টিমের প্রতিবেদন অনুযায়ী কলকতা বন্দর বছরে প্রায় ৪ লাখ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করে।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের গভীর সমুদ্রবন্দর সেল সূত্রে জানা গেছে, এ বন্দরটি নির্মাণ হলে মাত্র এক শতাংশ আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্পন্ন হবে। দেশের আমদানি-রফতানির কাজে বাকি ৯৯ শতাংশ ব্যবহার হবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো পণ্য পরিবহন কমাতে ও সময় বাঁচাতে গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণ কাজ শুরু করেছে।
এ জন্য ভারতে সাত হাজার টিইউস, শ্রীলঙ্কায় আট হাজার টিইউস ক্ষমতা সম্পন্ন কন্টেইনার জাহাজ আসতে পারে। দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হলে ৪ হাজার টিইউস ক্ষমতা সম্পন্ন কন্টেইনারবাহী জাহাজ আসতে পারবে। কারণ চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের গভীরতা কম থাকায় বড় জাহাজ আসতে পারে না।
লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য গভীর সমুদ্র থেকে বন্দরে আনতে হয়। গভীর সমুদ্র বন্দর হলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হবে। বর্তমানে বড় জাহাজগুলো গভীরতা কম থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে আসছে না।
সিঙ্গাপুরে পণ্য খালাস করার পর সেটি ছোট জাহাজে করে বন্দরে আনা হচ্ছে। এ গভীর সমুদ্র বন্দরটি স্থপিত হলে সরাসরি বড় জাহাজগুলো ভিড়তে পারবে। ফলে সময় ও পরিবহন খরচ কয়েক গুণ কমে আসবে। এর ফলে সবচেয়ে উপকার ভোগী হবে তৈরি পোশাক খাত।
মহেশখালীর সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর থেকে বিভিন্ন দেশে এবং আভ্যন্তরীণ পর্যায়ে পণ্য পরিবহন দ্রুত ও যথাযথভাবে করার জন্য সমুদ্র ও নদীপথ ছাড়া ও কক্সবাজার জেলার চকরিয়া এলাকায় রেল ও সড়ক যোগাযোগ করা হবে।
সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করে পুরো দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীকে আর্ন্তজাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি আধুনিক শহর গড়ে তোলা হবে।
গভীর সমুদ্র বন্দর সেল বন্দরের ডিজাইন তৈরি, কনসালট্যান্ট নিয়োগের কার্যক্রম এগিয়ে নেয়াসহ অন্যান্য পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক কাজ করবে। গভীর সমুদ্র বন্দর সেলের নিয়ম-নীতি তৈরি করবে এবং অনুমোদন হওয়ার পর গভীর সমুদ্র বন্দর কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে এবং কর্তৃপক্ষ পুরো গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজ পরিচালনা করবে।
এদিকে সরকার সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হওয়ায় মহেশখালীতে জমির মূল্য হু-হু করে বেড়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সচিব পদমর্যাদার আমলা থেকে শুরু করে দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, সুপ্রীম র্কোটের আইনজীবী, দেশের শীর্ষ ব্যক্তিদের আত্নীয়-স্বজন, সরকারী কর্মকর্তাসহ অনেকেই ইতোমধ্যে মহেশখালীতে জমি ক্রয় করেছেন।
এলাকাবাসী অবিলম্বে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কাজ আরম্ভ করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোর আবেদন জানান।
ঢাকা, এএম, ৫ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম)
শ্রেণীহীন
সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত, সময় লাগবে ৪৩ বছর
অবশেষে কক্সবাজারের উপকুলীয় দ্বীপ মহেশখালীর সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দরের নির্মাণে সাড়া দিয়েছে ডেনর্মাক সরকার। ২০১১ সালে বন্দর নিমার্ণ কাজ আরম্ভ হয়ে তা ২০৫৫ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা রয়েছে।





