শৌচাগার, ওজুর জায়গা ও গোসলখানা—সবই আছে। আর তা প্রচুরও। কিন্তু সে তুলনায় মানুষ অনেক বেশি। এর পরও তাঁদের এসব প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য নিয়ে কোনো তোড়জোড় নেই। নেই কোনো ঠেলাঠেলি। সবাই মিলেমিশে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট রেখে সেরে যাচ্ছেন নিজ নিজ কাজ।
শনিবার সকালে থেকে বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে রাজধানীর অদূরে তুরাগ তীরে সমবেত লাখো মুসল্লির মধ্যে এই দৃশ্য দেখা যায়।
অনেক মানুষ একসঙ্গে থাকায় শৌচাগার ব্যবহার,ওজু ও গোসল করা নিয়ে সাময়িক সমস্যা হলেও মুসল্লিদের মধ্যে নেই ক্ষোভ বা কারও প্রতি কোনো অভিযোগ।
আজ ইজতেমার প্রথম পর্বের দ্বিতীয় দিন। সকালে ইজতেমা মাঠের পূর্ব পাশে বাটা কারখানার ঠিক পেছনে গিয়ে দেখা যায়,সেখানে একটি শৌচাগারের সামনে মুসল্লিদের ভিড়। সবাই সার বেঁধে নিজ নিজ কাজ সারছেন। কারও জরুরি তাগিদ থাকলে আরেকজন স্বচ্ছন্দে ছাড় দিচ্ছেন।
কড়া নিরাপত্তায় টঙ্গীর তুরাগ তীরে চলছে তাবলিগ জামাতের বার্ষিক সম্মিলন বিশ্ব ইজতেমা। লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লির অংশগ্রহণে শুক্রবার বাদ ফজর বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইজতেমার মূল পর্ব। বাংলার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষায় মূল বয়ান তরজমা করা হচ্ছে।
অবশ্য বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব থেকেই ঈমান,আমল ও আখলাকের আ’ম বয়ানের মধ্য দিয়ে এবারের বিশ্বইজতেমার সূচনা ঘটেছে।
সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক ও সভাপতিত্বহীন এই বিশ্ব সম্মিলনে যোগ দিতে দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ এখনো টঙ্গীর পথে। শীত ও কুয়াশা উপেক্ষা করে গত কয়দিনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে টঙ্গীর ময়দানে এসে ইজতেমায় যোগ দিয়েছেন অনেকেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও মুসল্লিদের আসা অব্যাহত রয়েছে।
রোববার দুপুরে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম দফা। চারদিন বিরতি দিয়ে আবারো ৩১ জানুয়ারি শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় দফা।
২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে এবারের বিশ্বইজতেমার তাবলীগ সম্মেলন।
মুসল্লিদের স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় ২০১১ সাল থেকে টঙ্গীতে দু’দফায় বিশ্বইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ইজতেমাস্থলে বিদেশি ও সাধারণ মুসল্লিদের নিরাপত্তা দিতে পুলিশ,আনসার ও র্যা ব সদস্যসহ বিভিন্ন গোয়েন্দাসংস্থার সদস্যরা নিরাপত্তা ও শান্তি শৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
ইজতেমা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী মঙ্গল কামনা করে শুভেচ্ছা বাণী দিয়েছেন।
এদিকে এই সম্মিলনকে কেন্দ্র করে টঙ্গী এখন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। তুরাগ মাঠের আশে-পাশে চলছে মুসল্লিদের অজু, গোসল আর রান্নার আয়োজন।
বিশ্বইজতেমার আয়োজক কমিটির মুরুব্বি মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, ১৬০ একরের সুবিশাল ময়দানের পুরোটাই চটের সামিয়ানা টানিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। সাধারণ মুসল্লীদের রান্না-বান্নার স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব না হলেও মাঠের পশ্চিম-উত্তর কোণায় টিন শেডের উন্নত আবাসনে বিদেশি মুসল্লিদের রান্নার জন্য গ্যাসসহ বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ এবং আধুনিক সুবিধা রয়েছে।
এ বছর মাঠে জেলাওয়ারি মুসল্লিদের অবস্থানের জন্য পুরো ময়দানকে প্রথম দফায় ৪০টি এবং দ্বিতীয় দফায় ৩৮টি খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে।
ইজতেমার জরুরি তথ্য জানতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বেশ কিছু টেলিফোন নম্বর সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম-৯৮১৩৪০১-২, পুলিশ কন্ট্রোল রুম-৯৮১৩৪০৩, পুলিশ সাব-কন্ট্রোল রুম-(১)-৯৮১৩৪০৪, পুলিশ সাব-কন্ট্রোল রুম-(২)- ৯৮১৩৪০৫, র্যা ব কন্ট্রোল রুম-(১) ৯৮১৫১১২, র্যা ব সাব-কন্ট্রোল রুম-(২)-৯৮১৫১১৩, র্যা ব সাব-কন্ট্রোল রুম-(৩)-৯৮১৫১১৪, স্বাস্থ্য বিভাগ কন্ট্রোল রুম-৯৮১৩৪০৬, ৯৮১৭৫১৪-৯৮১৭৫১৫ ও ৯৮১৭৫১৬, টঙ্গী হাসপাতাল- ৯৮০১০৭৮, গাজীপুর সিটি কন্ট্রোল রুম- ৯৮১৩৪০৭, ইজতেমা কর্তৃপক্ষ তথ্য কেন্দ্র- ৯৮১৬৩৭০-৭১, ৯৮১৬৩৭২ ও ৯৮১৬৩৭৩ ও ৯৮১৬৩৭৪, ফায়ার সার্ভিস কন্ট্রোল রুম- ৯৮১৬৩৬৯, বিদ্যুৎ বিভাগ-৯৮১৬৩৭৯।
র্যা ব-১ এর মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান জানান,এবার র্যাাব সদস্যের সংখ্যা গতবারের চেয়েও বেশি থাকছে। কয়েকটি সেক্টরে ভাগ করে তারা পুরো ইজতেমা এলাকা ও আশে-পাশে নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন। দু’পর্বের ইজতেমার মূল ছয়দিন র্যাাবের হেলিকপ্টার টহল দিবে। খিত্তায় খিত্তায় সাদা পোশাকে র্যা ব সদস্যরা থাকবেন। র্যা বের বোমা নিষ্ক্রিয় দলও মাঠে রয়েছে বলে জানান তিনি।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার আব্দুল বাতেন জানান,ইজতেমা মাঠের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য র্যাাব পুলিশসহ এবার ১১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন রয়েছে। পুলিশ ও র্যা বের বেশ কিছু সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বিক নিরাপত্তা মনিটরিং করা হচ্ছে। এছাড়া বাইনোকুলার, মেটাল ডিটেক্টর, কন্ট্রোল রুমও স্থাপন করা হয়েছে।
১৯৪৬ সালে প্রথম কাকরাইল মসজিদে ইজতেমার আয়োজন শুরু করা হয়। তারপর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামের হাজি ক্যাম্পে ও ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ১৯৬৬ সালে গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বর্তমানস্থলে স্থানান্তর করা হয়েছে। পরে সরকারিভাবে তুরাগ তীরের ১৬০ একর জমি স্থায়ীভাবে ইজতেমার জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়।
গত শুক্রবার আম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। আর প্রথম পর্বে এরইমধ্যে অংশ নিতে লাখ লাখ মুসল্লি সমবেত হয়েছেন টঙ্গীর তুরাগ তীরে। এ পর্বের আখেরি মোনাজাত আগামীকাল রোববার অনুষ্ঠিত হবে। আর দ্বিতীয় পর্ব আগামী ৩১ জানুয়ারি শুরু হয়ে ২ ফেব্রুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে।
এবার দুই পর্বের ইজতেমায় ৫০ লাখের বেশি মুসল্লি অংশ নেবেন। বিদেশি ক্যাম্পের একজন জিম্মাদার জানান, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল,সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, আমেরিকা, কানাডা,ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩০ হাজার বিদেশি মেহমান ইজতেমায় অংশ নিচ্ছেন।
ঢাকা, ২৫ জানুয়ারি (টাইম নিউজ//এআর)





