গত কয়েক মাসে শাহজালাল ও শাহ আমানত বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি সোনার বড় চালান আটক হয়েছে। এর সাথে ছোট ছোট সোনার চালান আটক তো চলছে হরহামেশাই। চলতি সপ্তাহে গত শনিবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাই ফেরত একটি উড়োজাহাজ থেকে ১০৬ কেজি সোনা আটকের পর সর্বমহলে কৌতূহল জাগে সোনার চালান আসছে কিভাবে? কারা এই সোনা পেয়ে যাচ্ছে? আটককৃত সোনার শেষ গন্তব্যই বা কোথায়?
ব্যবসায়ী, শুল্ক গোয়েন্দা ও কাস্টমস বিভাগের কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বৈধ পথে এলসির মাধ্যমে সোনা আমদানির নজির নেই।
[b]চোরাই সোনায় চলছে দেশীয় জুয়েলারি[/b]
শুল্ক গোয়েন্দা ও কাস্টমস বিভাগের কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে সোনার দোকান আছে ২০ থেকে ২২ হাজার। এসব দোকানে দৈনিক বেচাকেনা হয় গড়ে ২০ কোটি টাকার।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1398746234.jpg[/img]
কিন্তু বৈধ পথে এলসির মাধ্যমে সোনা আমদানির নজির নাই। ফলে দেশের এসব জুয়েলারি দোকানেও মূলত: চোরাই পথে আসা সোনা দিয়েই মেটানো হচ্ছে স্বর্ণালংকারের চাহিদা।
[b]ভারতই এখন মূল ক্রেতা[/b]
আগে শুধু বাংলাদেশের জন্যই চোরাচালানীরা অবৈধ পথে স্বর্ণের চালান পাঠাতো। কিন্তু এখন ভারতই প্রধান ক্রেতা। বিমানবন্দরে দফায় দফায় সোনার চালান জব্দ হওয়ার পর ভারতের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। 
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1398746236.jpg[/img]
বাংলাদেশে চোরাই পথে আনা বিপুল পরিমাণ সোনা স্থলপথে পাচার করা হচ্ছে ভারতে। সেই দেশে সোনা আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বৃদ্ধির কারণেই বাংলাদেশকে করিডর হিসেবে ব্যবহার করছে পাচারকারীরা।
[b]যে কারণে ভারতে পাচার করা হচ্ছে সোনা[/b]
প্রতিবেশী দেশ ভারতে সোনার দাম বেশি এবং বৈধভাবে সোনা আমদানিতে কড়াকড়ি ও নতুন করারোপ করা হয়েছে। কিন্তু ভারতে তৈরি সোনার অলংকারেরও প্রচুর চাহিদা রয়েছে বিশ্ববাজারে। এ কারণেই সোনার চোরাচালান ঘটছে একের পর এক। আর এ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1398746238.jpg[/img]
ভারতে সোনার আমদানি শুল্ক সম্প্রতি ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা সোনা আমদানিতে উৎসাহ হারিয়েছে। তাই বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোকে এখন সোনা চোরাচালানের করিডর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বেশিরভাগ সোনার চালান যাচ্ছে চট্টগ্রাম হয়ে।
[b]যেভাবে সোনার আমদানী ও পাচার হচ্ছে[/b]
অনুসন্ধানকালে জানা গেছে, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে মূলত: এসব সোনার চালান আসে বিদেশ থেকে।
মূল্য বিনিময় হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। এ ছাড়া অস্ত্রের বৃহৎ চালানও সোনার লেনদেনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয় বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অস্ত্র কেনার বিপুল পরিমাণ টাকা দেশ থেকে বৈধ পথে পাঠানো সম্ভব হয় না বলেই অবৈধ পন্থায় সোনা পাচার করা হয়ে থাকে। কিন্তু জব্দ হওয়া সোনার মূল্য হুন্ডির মাধ্যমে পরিশোধ হচ্ছে, নাকি অস্ত্রের মূল্যে পরিশোধে পাচার হচ্ছে- সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1398746240.jpg[/img]
জানা যায়, বাংলাদেশ ও দুবাইয়ের বাজারে প্রতি ভরি সোনার দামে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত পার্থক্য থাকায় দুবাইয়ে হুন্ডির টাকায় সোনা কিনছে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা। সেই সোনা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশে।
জানা গেছে, বিমানের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বিমানবন্দরে অবতরণের পর কিছু যাত্রী নেমে যায়। আবার অভ্যন্তরীণ কিছু যাত্রী আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে চড়ে অন্যত্র চলে যায়। এই ফাঁকে চোরাচালানি হয়ে আসা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের যাত্রী অভ্যন্তরীণ যাত্রীর কাছে সোনা হস্তান্তর করে। আর ওই সোনা নিয়ে চোরাকারবারি অন্য অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের সঙ্গেই বেরিয়ে যায়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের যাত্রীর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ যাত্রীর একসঙ্গে একই বিমানে চড়ার সুযোগ থাকায় আকাশপথেই মূলত চোরাই সোনার ব্যাগ হাতবদল হয়।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপারেশন অ্যান্ড ক্রাইম) বনজ কুমার মজুমদার টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ‘বিমানবন্দরে চোরাচালান হয় সুনিয়ন্ত্রিত ও নির্দিষ্ট চেইনে। চোরাচালান কারা করছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আসলেই কেউ জড়িত কি না, সে বিষয়ে পুলিশ অনুসন্ধান শুরু করেছে।’
[b]অবৈধ চালানকৃত সোনা দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে কম[/b]
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিমান ও স্থল বন্দরগুলো দিয়ে আসা এসব সোনা বাংলাদেশে খুব কম ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন পথে এসব সোনা পাচার হয়ে যাচ্ছে ভারতে।
জুয়েলার্স ব্যবসায়ী ও শুল্ক কর্মকর্তারা জানান, পূর্বে একজন প্রবাসী ৪ কেজি পর্যন্ত সোনা আমদানী করতে পারতেন। কিন্তু পরে সে নিয়ম পরিবর্তন করা হয়। 
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1398746243.jpg[/img]
বিদেশফেরত একজন প্রবাসী বৈধভাবে এখন সর্বোচ্চ ২০০ গ্রাম সোনা আনতে পারেন। বিদেশে বিপুল পরিমান প্রবাসী বাংলাদেশী থাকে। মূলত প্রবাসীদের আনা সোনা দিয়েই দেশের বাজারের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। দেশে গ্রাহকদের বেশির ভাগ চাহিদা বৈধপথে আনা সোনার দিয়েই পূরণ করা হচ্ছে বলে দাবি বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক সুভাষ চন্দ্রের।
[b]সোনার অবৈধ চালান ব্যবসায় জড়িত যারা[/b]
ঢাকার হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে একের পর এক চালান আটক করে শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা। আমদানীতে আর এ কাজে জড়িত রয়েছেন এ দেশেরই বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা। তাদের সাথে আছেন বেশ কিছু অসাধু সোনা ব্যবসায়ীরাও। শুল্ক গোয়েন্দা ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
[b]গত এক বছরে ৫ শ’ কেজি সোনার চালান আটক[/b]
গত ১৩ মাসে ৬ মণের বেশি সোনা ধরা পড়েছে শাহ আমানতে বিমানবন্দরে। এ বিমানবন্দরে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চালানটি ধরা পড়ে গত ২৫ মার্চ। কয়েকজন যাত্রীর সিটের নিচে এবং বিমানে তল্লাশি চালিয়ে ১০৭ কেজি ওজনের ৯২৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1398746245.jpg[/img]
চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টমস শাখার সহকারী কমিশনার মশিউর রহমান মণ্ডল বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের ২৫ তারিখ পর্যন্ত ৪৯টি চালানে প্রায় ২০০ কেজি সোনা জব্দ করা হয়। এর বাজারমূল্য প্রায় ৮২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে গত ১ বছরে রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি সোনার বড় চালান ধরা পড়ে। শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান টাইম নিউজবিডিকে বলেন, গত এক বছরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান থেকে প্রায় সাড়ে ৩ শ’ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে।
[b]সোনা আমদানীতে নেই কোনো নীতিমালা[/b]
বাংলাদেশে সোনা আমদানীতে নেই কোনো নীতিমালা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড না বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হয়ে এই নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়ন করবে তা নিয়ে চলছে টানাপোড়েন।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. দীলিপ রায় টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ‘বাংলাদেশে সোনা আমদানির নীতিমালা নেই। সেই কারণে বৈধ পথে এলসি খুলে সোনা আমদানি হচ্ছে না। মূলত নীতিমালা না থাকার কারণেই ব্যবসায়ীরা সোনা আনতে পারছেন না।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1398746246.jpg[/img]
তিনি বলেন, সোনা আমদানির নীতিমালা করার জন্য আন্দোলন করা হয়। এরপ্রেক্ষিতে সরকার উচ্চপর্যায়ে একটি কমিটি গঠন করে দেয়। এই কমিটি গঠনের পর নীতিমালা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নাকি শিল্প মন্ত্রণালয়,  না জাতীয় রাজস্ববোর্ড- বাস্তবায়ন করবে তা নিয়ে কমিটির মধ্যেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফলে এখনো সোনা আমদানির নীতিমালা চূড়ান্ত হয়নি।
তাই পুরনো সোনা রিফাইন করে এবং কাস্টমসের ব্যাগেজ সুবিধায় ২০০ গ্রাম পর্যন্ত আনা প্রবাসীদের সোনার ওপর ভর করেই জুয়েলারি ব্যবসা করতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
[b]সোনা চালানের ঘটনায় দায়ের করা মামলার অগ্রগতি হয় না[/b]
সোনা, মোবাইল ফোনসেটসহ গ্রেপ্তার আসামিদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইনে মামলা করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এরপর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আসামির বিষয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করে না। শেষ পর্যন্ত আসামি আদালত থেকে জামিনে মুক্তির পর লাপাত্তা হয়ে যায়।
তবে পুলিশের হাতে আটক হলে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়। কিন্তু আসামি জামিনে মুক্তির পর পালিয়ে যায়। ফলে বড় ধরনের কোনো চোরাকারবারির কঠোর সাজার নজির নেই।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. বাবুল আক্তার জানান, সোনা চোরাচালান মামলায় মূলত বাহক গ্রেপ্তার হয়। তাদের কাছে খুব বেশি তথ্য থাকে না। এ কারণে তদন্ত খুব বেশি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না।
শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান টাইম নিউজবিডিকে বলেন, কাস্টমস বিভাগের লোকজনই চোরাকারবারিদের সহযোগিতা করে। সাধারণ যাত্রীদের সব লাগেজ স্ক্যানিং করা হলেও চোরাকারবারিদের কিছু লাগেজ স্ক্যানিং করা হয় না। সোনা চোরাচালানের সঙ্গে সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
[b]আটক সোনার যাচ্ছে কোথায়?[/b]
সম্প্রতি বড় বড় কয়েকটি সোনার অবৈধ চালান আটকের পর প্রশ্ন উঠেছে বিমানবন্দর থেকে শুল্ক বিভাগ হয়ে সোনা কোথায় যাচ্ছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কাজী ছাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি টাইম নিউজবিডিকে বলেন, “আটক সোনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হওয়ার পর তা ভল্টে ঢোকানো হয়। এরপর সোনার অবৈধ চালান সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো ভল্টেই থাকে।”
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1398746248.jpg[/img]
তিনি জানান, মামলা নিষ্পত্তি ঘটলে এই সোনা বাজেয়াপ্ত হয়। এরপর বাজেয়াপ্ত করা সোনাগুলো নিলামে তোলা হয়। বিক্রি করা টাকা সরকারের কোষাগারে জমা হয়।
[b]ঢাকা, জেইউ, ২৮ এপ্রিল(টাইমনিউজবিডি.কম)//এসএইচ[/b]