স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের ৪৩তম বার্ষিকী আজ বুধবার। ১৯৭১ সালের এই দিনে জয়দেবপুরে (গাজীপুর) ভাওয়াল রাজবাড়িতে তৎকালীন সেনানিবাসে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার উদ্দেশ্যে ব্রিগেড কমান্ডার জাহানজেবের নেতৃত্বে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একদল সৈন্য জয়দেবপুর সেনানিবাসে আগমন করবে এই খবর পেয়ে জয়দেবপুরের সর্বস্তরের জনসাধারণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তারা রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেট গড়ে তুলে।
ওই সময় জয়দেবপুর সেনানিবাসের অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল মাসুদ ও সহ অধিনায়ক ছিলেন মেজর কেএম শফিউল্লাহ। এসময় গাজীপুরের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা মরহুম শামসুল হক পাক হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতাকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য হাবিব উল্লাহর নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি হাই কমান্ড এবং বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক এমপিকে আহ্বায়ক করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি অ্যাকশন কমিটি গঠন করা হয়। নেতাদের পরামর্শে ছাত্র- শ্রমিক -জনতা পাক হাননাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার রাস্তায় বহু সংখ্যক ব্যারিকেড তৈরি করে।
দুপুরের দিকে পাক হানাদার বাহিনী চান্দনা চৌরাস্তায় উপস্থিত লোকজনকে অস্ত্রের মুখে ব্যারিকেড সরাতে বাধ্য করে সেনানিবাসে প্রবেশ করলে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা পূনরায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। ছাত্র-জনতা জয়দেবপুর রেলওয়ে লেভেল ক্রসিংএ মালগাড়ির ওয়াগন ফেলে বন্দুক ও বাঁশের লাঠি নিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে।
সেনানিবাস থেকে ফেরার পথে জয়দেবপুর লেভেল ক্রসিংএ পাক হানাদার বাহিনী উপস্থিত হলেই স্থানীয় সাহসী বীরদের বন্দুক গর্জে উঠে। পাক হানাদার বাহিনীর প্রতি কাজী আজিম উদ্দিন আহমেদ (মাস্টার) নিজ বন্দুক দিয়ে প্রথম গুলিবর্ষণ করেন। ওই সময় হানাদার বাহিনী পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে নিয়ামত, মনুখলিফা শহীদ হন এবং সন্তষসহ বহু লোক আহত হন।
জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্ত পর্যন্ত রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেট থাকায় হানাদার বাহিনী পায়ে হেঁটে চান্দনা চৌরাস্তায় উপস্থিত হলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তার মিয়ার নেতৃত্বে স্থানীয় ছাত্র-জনতার সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে তারা এলোপাথারি গুলি বর্ষণ করে। এখানে গুলিতে হুরমত আলী শহীদ হন এবং কানু মিয়াসহ অনেকে আহত হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে কানু মিয়া মারা যান।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে আমাদের চূড়ান্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ হলেও এর পূর্বেই ১৯মার্চ গাজীপুরে তথা জয়দেবপুরের মাটিতেই সূচিত হয়েছিল দখলদার বর্বর পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী বীর বাঙ্গালীর পক্ষ থেকে প্রথম সশস্ত্র গণ প্রতিরোধ।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এই দিবস স্মরণীয় করে রাখার জন্য তৎকালীন ১৬ বেঙ্গল রেজিমেন্টের উদ্যোগে ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-গাজীপুর সড়কের মিলনস্থল চান্দনা চৌরাস্তায় মুক্তিযোদ্ধার প্রতীক (এক হাতে রাইফেল অপর হাতে গ্রেনেড) মুক্তিযোদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‌‌‌'জাগ্রত চৌরঙ্গী' নির্মাণ করা হয়। এই ভাস্কর্যটি এখনো দূর-দূরান্তের লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এ দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে গাজীপুর জেলা প্রশাসন, আওয়ামীলীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন সমূহ ও শহীদ হুরমত স্মৃতি সংসদ দিন ব্যাপি বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।
[b]ঢাকা, ১৮ মার্চ (টাইমনিউজবিডিডটকম) // ইএইচ // জেআই[/b]