[b]ঢাকা:[/b] আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পাঁচ বছরে (২০০৯-১৩) ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে গড়ে বছরে সুদ মওকুফ করা হয়েছে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। তার আগের দুই সরকারের মেয়াদে মওকুফ করা হয়েছিল সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার সুদ। সাত বছরের ব্যবধানে সুদ মওকুফ বেড়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ৬০ শতাংশ।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, নিছক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া অনৈতিক সুবিধার কারণে ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ বাড়ছে। এ ধরনের ‘সুবিধা’কে ব্যাংকিং খাতের জন্য ‘মরণব্যাধি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত মতে, আলোচ্য সময়ে মওকুফ করা মোট সুদের অধিকাংশই রাষ্ট্রীয় ও বিশেষায়িত খাতের আট ব্যাংকের। সুদ মওকুফের শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংক লিমিটেড। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জনতা ব্যাংক। আর বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুদ মওকুফের সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা বিডিবিএল। আর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৫৯৪ কোটি দুই লাখ টাকার সুদ মওকুফ করা হয়েছে। এর আগের চারদলীয় জোট এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাত বছরে এর পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা।
এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যাংকগুলো করেছে তিন হাজার ৮৭৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। বেসরকারি ও বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলো করেছে বাদবাকি টাকা।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত কৃষি, এসএমইসহ রাষ্ট্রীয় ও বিশেষায়িত খাতের আটটি ব্যাংকের মোট ৬৫ হাজার ৯২৫ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে সুদ তিন হাজার ৮৭৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা মওকুফ করা হয়েছে।
এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকে ৭১০ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংক ৫৬৫ কোটি ২০ লাখ টাকা ও রূপালী ব্যাংক ৪০০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করেছে। এছাড়া কৃষি ব্যাংক ৬৭ কোটি ২৫ লাখ, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ২৩ কোটি ৬৪ লাখ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ২০১ কোটি ৮৯ লাখ এবং বেসিক ব্যাংক ১৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করেছে।
একক বছর হিসেবে ২০১৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সরকারি মালিকানাধীন চার ব্যাংক মিলে সুদ মওকুফ করেছে ৩৭৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
আলোচ্য বছরে সবচেয়ে বেশি সুদ মওকুফ করা হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসে। এর পরিমাণ ১১৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বিশেষায়িত খাতের ব্যাংকগুলো এ বছরে খেলাপি ঋণের বিপরীতে সুদ মওকুফ করেছে ১৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। গত অক্টোবরে এ খাতের ব্যাংকগুলো তুলনামূলক বেশি তিন কোটি ২৭ লাখ টাকার সুদ মাফ করেছে।
বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নভেম্বর পর্যন্ত ঋণের বিপরীতে সুদ মওকুফ করেছে ৩৬২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। ওই বছরের মার্চ মাস ও জুন শেষে এসব ব্যাংকে সুদ মওকুফের হিড়িক ছিল বেশি।
এদিকে ২০১৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলো একত্রে পাঁচ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সমপরিমাণ সুদ মওকুফ করেছে। আলোচ্য বছরের জুন মাসে ৫৪ লাখ টাকা ও জুলাইতে ৫৭ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করেছে এ খাতের ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ঋণ খেলাপিসহ নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ
বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সুদ মওকুফের পরিমাণ। ফলে একদিকে ব্যাংকগুলোর আয় কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে আন্তঃব্যাংক প্রতিযোগিতাও পিছিয়ে পড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে চার লাখ ৪৩ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়। ওই সময়ে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৬ হাজার ৭২০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১২ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের সরকারগুলোর এ ধরনের তৎপরতা থেকে বর্তমান সরকার বেরিয়ে আসবে, সে প্রত্যাশা থাকলেও উল্টো চিত্র হতাশ করেছে। শুধু তাই নয়, এটি ব্যাংকিং খাত এবং পুরো দেশের অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক।
তারা বলছেন, রাজনৈতিক বিচেনায় অধিকাংশ সুদই মওকুফ করা হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতে যেসব প্রতিষ্ঠানকে সুদ মওকুফের সুবিধা দেওয়া হয়, তা অধিকাংশই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ মহলের সম্পৃক্ততার কারণে এসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে।
তিনি আরো বলেন, এভাবে কিছু মানুষ সুবিধা পেতে থাকলে অন্যরা যারা নিয়মিত ঋণ শোধ করছেন, তারাও টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখাবেন। এতে করে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মোট দুই লাখ ১৭ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে চার হাজার ৬৮০ কোটি ৯৯ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করা হয়েছে। আর ২০১২ সালের জুন থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে সুদ মওকুফ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা।
এক বছরেই সোনালী ব্যাংক মওকুফ করেছে ৩৪২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, জনতা ব্যাংক করেছে ৩৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, রূপালি ব্যাংক মওকুফ করেছে ৪৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংক করেছে ছয় কোটি টাকা।
সুদ মওকুফের ব্যাপারে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও প্রদীপ কুমার দত্ত বলেন, রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যাংকগুলোতে ব্যাংকিং ব্যবসা করার পাশাপাশি সরকারের অনেক অলাভজনক খাত দেখতে হয়।
এখন কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যদি বছরের পর বছর টাকা দিতে ব্যর্থ হয়, সেক্ষেত্রে ঋণ অবলোপনের পাশাপাশি সুদ মওকুফ করতে হয়। তবে তার পরিমাণ খুব অল্প বলেও এ সময় মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দীন বলেন, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার কারণেই ব্যাংকগুলোতে সুদ মওকুফের পরিমাণ বাড়ছে। ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতা নির্বাচনেই ভুল করে। অনেক সময় তারা রাজনৈতিক বিবেচনায় অসাধু প্রকৃতির ব্যবসায়ীদের ঋণ দিচ্ছে। পরে তারাই ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়। দুর্নীতি, প্রভাব খাটানো, অদক্ষতা প্রভৃতি বিষয় এক্ষেত্রে কাজ করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, ঋণখেলাপিরা অর্থঋণ আদালতের আশ্রয় নেন এবং আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে পার পেয়ে যান। এতে ব্যাংকের তহবিল ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, ফলে সুদ হার কমছে না। তার ওপরে আবার বিশেষ মহলের চাপে সুদ মওকুফ করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ পাঁচ বছরে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
[b]টাইমনিউজবিডি/এসএমআর[/b]
শ্রেণীহীন
রাজনৈতিক বিবেচনায় ৫৫০০ কোটি টাকা সুদ মওকুফের রেকর্ড গড়েছে সরকার
ঢাকা: আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পাঁচ বছরে (২০০৯-১৩) ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে গড়ে বছরে সুদ মওকুফ করা হয়েছে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। তার আগের দুই সরকারের মেয়াদে মওকুফ করা হয়েছিল সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার সুদ।





