ঢাকা: অবৈধ অভিবাসী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানে নেমেছে সৌদি আরব। এ অভিযানে বিতাড়িত হয় অভিবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ। অভিযান শুরুর প্রথম মাসেই ১ লাখ ৩৭ হাজারের মতো অবৈধ শ্রমিককে কর্মক্ষেত্র ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। দেশটির এ কঠোর অবস্থানের কারণে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় বাড়ি ফিরতে হয়েছে এসব শ্রমিককে।

গত মাসে ইথিওপিয়ার প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার অবৈধ শ্রমিক সৌদি আরব থেকে নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হন। এদের মধ্যে একজন হলেন ২৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ আহমেদ। তিনি জানান, সৌদি আরবে প্রায় পাঁচ বছর কাজ করার পর প্রায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাকে বের করে দেয়া হয়েছে। হঠাৎ করেই এ ধরনের কঠোর সিদ্ধান্তে বেশির ভাগ সম্পদই সেখানে ফেলে আসতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

পাঁচ বছর আগে লোহিত সাগর দিয়ে একটি মাছ ধরার ট্রলারে করে অবৈধ পথে সৌদি আরবে ঢুকেন আহমেদ। তার মতো সৌদি আরবের বিভিন্ন উপকূল দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন অসংখ্য শ্রমিক। এছাড়া প্রতি বছর হজের সময়ে অনেকেই এখানে থেকে যান। প্রতি বছর হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে ২০ লাখেরও বেশি মানুষের সমাগম হয়।

চলতি বছরের নভেম্বরে ভিসা আবেদন নবায়নের সর্বশেষ সুযোগ শেষ হওয়ার পর কঠোর অবস্থানে যায় সৌদি প্রশাসন। এ সময়ে তারা দেশটির বিভিন্ন দোকান, অফিস এমনকি বাড়ি বাড়ি গিয়েও খোঁজ নেয় অবৈধ অভিবাসীদের। অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে দেশটি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন কয়েক লাখ শ্রমিক।

সরকার পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক তাদের ভিসা পরিবর্তন করে এ দেশে থেকে যাওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। অন্যদিকে আরো ১০ লাখ শ্রমিকের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। এসব শ্রমিক ভবিষ্যতে নতুন ভিসার জন্য আবেদন জানাতে পারবেন। অতীতেও সৌদি সরকার এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো দেশটির এক কোটিরও বেশি অভিবাসী শ্রমিক খুবই কম খরচে বিভিন্ন কাজ করতে আগ্রহী।

সৌদি আরবের অভিবাসী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নেয়া কঠোর অবস্থানের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো দেশটির ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। স্থানীয়ভাবে এখানকার অধিকাংশ তরুণ বেকার রয়েছেন। আর এদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চায় সরকার। স্থানীয় পর্যায়ে দুই কোটি তরুণ এখন বেকার জীবন কাটাচ্ছেন।

এত দিন তেল থেকে আসা রাজস্ব দেশটির অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও এ অবস্থায় পরিবর্তন আনতে চাচ্ছে দেশটি। অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা হলে দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।

২০১১ সালে আরব বসন্ত শুরুর পর থেকে গণতন্ত্র নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশে। এতে রাজতন্ত্রে পরিচালিত সৌদি আরব এ ধরনের অবস্থা এড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে থাকে। আরব বসন্তের অন্যতম কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। ফলে বেকারত্ব কমানোর জন্যে বিশেষ পদক্ষেপ নেয় সৌদি সরকার। যার ধারাবাহিকতায় খড়্গ নেমে আসে অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর।

খুবই অল্প সময়ের নোটিসে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়ার ফলে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় ফিরে গেছেন এসব অবৈধ শ্রমিক। তবে বৈধ পথে সৌদি আরবে আসা অভিবাসীরাও রয়েছেন বিভিন্ন সমস্যায়। একটি নির্দিষ্ট বেতন ও সুযোগ-সুবিধার আওতায় কাজের জন্য সৌদি আরবে এলেও অনেক সময়েই তারা প্রতারিত হচ্ছেন। তাদেরই একজন মোহাম্মদ ইউনুস। সৌদি আরবে একটি হোটেলে চাকরি নিয়ে আসেন তিনি। কিন্তু আসার পর তার স্পন্সর বছরে ৭ হাজার সৌদি রিয়াল দাবি করে। এ অর্থ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন ইউনুস। কিন্তু দেশ থেকে করে আসা বিশাল অঙ্কের ঋণ মেটানোর জন্য বিভিন্ন কম বেতনের চাকরি করেন তিনি। এমন ঘটনা সৌদি আরবের বেশির ভাগ কম বেতনের কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রায়শই ঘটে।

অভিবাসীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য এরই মধ্যে সৌদি সরকার একটি ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা হলেও বর্তমান অভিবাসী আইনে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না বলে জানায় সৌদি সরকার। সূত্র: অ্যারাবিয়ান বিজনেস।