[b]ঢাকা:[/b] গত ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়ে গেছে রাজধানীতে চলাচলের জন্য লাইসেন্স দেয়া প্রায় ১১ হাজার ট্যাক্সিক্যাবের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল। মালিকপক্ষ এরপর আয়ুষ্কাল বাড়ানোর আবেদন করলেও তা বিবেচনায় নেয়নি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। ফলে ১ জানুয়ারি বন্ধ হয়ে গেছে এসব ট্যাক্সিক্যাব চলাচল। নানা জটিলতায় নামতে পারেনি নতুন অনুমোদন পাওয়া ৩ হাজার ৭৫০টি ট্যাক্সিক্যাবও। সব মিলিয়ে ট্যাক্সিক্যাবশূন্য হয়ে পড়েছে রাজধানীর রাস্তা।
মধ্যবিত্তের বাহন হিসেবে ১৯৯৭ সালে রেয়াতি শুল্কে ট্যাক্সিক্যাব আমদানি ও পরিচালনার সুযোগ দেয় সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক বছরের মধ্যে ঢাকায় নামে ১১ হাজার ২৬০টি ক্যাব। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫১৩টি এসি (হলুদ রঙ) ও ৬ হাজার ৭৪৭টি নন-এসি (কালো ও নীল রঙ)।
এর বেশির ভাগই ছিল ৭৯৬ থেকে ১২৪২ সিসির মধ্যে। কম ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিন ও নিম্নমানের হওয়ায় পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রায় অর্ধেক ক্যাব বিকল হয়ে যায়।
প্রাথমিকভাবে ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল হিসাব করে ৯ বছরের জন্য লাইসেন্স দেয়া হলেও মালিক ও চালকদের দাবিতে তা আরো দুই বছর বাড়ানো হয়। সম্প্রতি ট্যাক্সিক্যাবগুলোর আয়ুষ্কাল আরো চার বছর বাড়িয়ে ১৫ বছর করার দাবি জানায় মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। নন-এসি ট্যাক্সিক্যাবগুলো চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ায় আবেদন আমলে নেয়নি বিআরটিএ।
ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ ট্যাক্সিক্যাবগুলো চলতি বছর জানুয়ারি থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এসি ক্যাবগুলোর অবস্থা কিছুটা ভালো থাকায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিআরটিএর পরিচালক (প্রকৌশল) মো. সাইফুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, রাজধানীতে চলাচলের জন্য লাইসেন্স দেয়া ১১ হাজার ২৬০টি ট্যাক্সিক্যাবের বেশির ভাগই অচল হয়ে পড়েছে। বাকিগুলোর আয়ুষ্কাল শেষ হয় গত ৩১ ডিসেম্বর। কিছু এসি ট্যাক্সিক্যাবের অবস্থা ভালো থাকায় সেগুলোর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদনের পরামর্শ করা হয়েছে। তবে নন-এসি ট্যাক্সিক্যাবের আয়ুষ্কাল আর বাড়ানো সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, গত ১১ বছরে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতিস্থাপন করা কিছু ট্যাক্সি এখনো রাজধানীতে চালু আছে। এর সংখ্যাও ১০০-এর নিচে। অন্যগুলো রাস্তায় দেখামাত্র আটকের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এদিকে ২০১১ সাল থেকে কয়েক দফা চেষ্টা করেও রাজধানীতে নতুন ট্যাক্সিক্যাব নামাতে পারছে না যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে রাজধানীতে পরিচালনার জন্য তমা গ্রুপকে ২৫০টি এবং আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে ৩ হাজার ৫০০ ট্যাক্সিক্যাব আমদানি ও পরিচালনার লাইসেন্স দেয়া হয়।
এছাড়া চট্টগ্রামে পরিচালনার জন্য আরো দেড় হাজার ট্যাক্সিক্যাবের লাইসেন্স দেয়া হয় আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে। এজন্য তিন মাস সময় বেঁধে দিলেও পেরিয়ে গেছে ছয় মাস। তবে এখনো কোনো ট্যাক্সিক্যাব আমদানি করা হয়নি। এর আগে দুই হাজার ট্যাক্সিক্যাব আমদানির লাইসেন্স দেয়া হলেও তাতেও ব্যর্থ হয় বেসরকারি দুই কোম্পানি।
জানা গেছে, নতুন ট্যাক্সিক্যাব নামানোর আগেই ভাড়া দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে তমা কনস্ট্রাকশন ও আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। বিদ্যমান হারে ট্যাক্সিক্যাবের ন্যূনতম ভাড়া ৪০ টাকা। প্রথম দুই কিলোমিটার বা তার কম পথ ভ্রমণের জন্য এ ভাড়া দিতে হয়। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য ভাড়া দিতে হয় ২০ টাকা। আর যাত্রা বিরতিকালে প্রতি মিনিটের জন্য চার্জ সাড়ে ৩ টাকা।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ট্যাক্সিক্যাবের ন্যূনতম ভাড়া হবে ৮০ টাকা। প্রথম দুই কিলোমিটার বা তার কম পথ ভ্রমণের জন্য এ ভাড়া দিতে হবে। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য ভাড়া দাঁড়াবে ৪০ টাকা। আর যাত্রা বিরতিকালে প্রতি মিনিটের জন্য সাড়ে ৭ টাকা করে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।
ভাড়া দ্বিগুণ করে গেজেট প্রকাশ না করা পর্যন্ত নতুন ট্যাক্সিক্যাব আমদানি করবে না বলে জানিয়েছে তমা গ্রুপ। তবে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার কারণে ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না যোগাযোগ মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক বিভাগের সচিব এমএএন ছিদ্দিক বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার কারণে এখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। বিষয়টি তমা গ্রুপকে জানানো হয়েছে। তবে ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন না হওয়ায় ট্যাক্সিক্যাব আমদানি না করাটা খুবই তুচ্ছ যুক্তি। প্রকৃতপক্ষে ট্যাক্সিক্যাব আমদানিতে প্রতিষ্ঠানটির সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।
এদিকে ট্যাক্সিক্যাব আমদানিতে আরও কিছু বিষয়ে সুবিধা চেয়েছে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। নীতিমালা অনুযায়ী ১৫০০ সিসির ট্যাক্সিক্যাব আমদানির লাইসেন্স দেয়া হলেও সংস্থাটি ১৪৮৫ সিসির ট্যাক্সিক্যাব আমদানির অনুমোদন চায় এর আগে। ইঞ্জিন সক্ষমতায় ১ শতাংশ ছাড়ের বিষয়টি নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত থাকায় বিআরটিএ বিষয়টি অনুমোদনও করে।
এখন সংস্থাটি নতুন করে ট্যাক্সিক্যাব নিবন্ধন ফি ১৫ হাজার থেকে কমিয়ে ২ হাজার টাকা এবং শুল্ক ও ভ্যাট থেকে পুরোপুরি ছাড় পাওয়ার আবেদন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে সংস্থাটি। ফলে শিগগিরই রাজধানীতে নতুন ট্যাক্সিক্যাব নামার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল বিভাগের অধ্যাপক ড. সারওয়ার জাহান বলেন, একটি দেশের রাজধানীর জন্য উপযোগী এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য অবশ্যই শক্তিশালী ট্যাক্সিক্যাব ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
এতে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ অনেকাংশে কমে যায়। তবে ঢাকায় ট্যাক্সিক্যাব ক্রমান্বয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ও নতুন ট্যাক্সিক্যাব না নামাটা অবশ্যই হতাশাজনক। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত। সূত্র: বণিক বার্তা