রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), ডিজিএফআই, র‍্যাব, সিটিটিসিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়।

গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে সংগঠনটি জানায়, যাচাই-বাছাই শেষে দেশে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুমের শিকার ২৪১ জন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী বলে দাবি তাদের।

তবে গুম কমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত ঘটনার বাইরেও গত দেড় দশকে ছাত্রশিবিরের সাত শতাধিক নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।

ছাত্রশিবিরের দাবি, ২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তাদের সাত নেতাকর্মীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তারা হলেন—ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রশিবির নেতা মো. ওয়ালীউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস, ঢাকার হাফেজ জাকির হোসেন, বেনাপোলের রেজওয়ান হোসেন, বান্দরবানের জয়নাল হোসেন, ঝিনাইদহের মু. কামরুজ্জামান এবং কক্সবাজারের শফিকুল ইসলাম।

সংগঠনটির অভিযোগ, ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রনেতা ওয়ালীউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসকে আশুলিয়ার নবীনগর এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

২০১৩ সালের ২ এপ্রিল রাতে ঢাকার শ্যামলীর বাসা থেকে হাফেজ জাকির হোসেনকে সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যান বলে দাবি করা হয়।

২০১৬ সালের ৪ আগস্ট বেনাপোলের দুর্গাপুর বাজার থেকে রেজওয়ান হোসেনকে প্রকাশ্যে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করে সংগঠনটি। একই বছরের ২৩ অক্টোবর বান্দরবান সদর থেকে জয়নাল হোসেন এবং ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল ঝিনাইদহের লেবুতলা থেকে মু. কামরুজ্জামানকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

এ ছাড়া ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে র‍্যাব সদস্য পরিচয়ে শফিকুল ইসলামকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়।

ছাত্রশিবিরের দাবি, এসব ঘটনার এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজ সাতজনের অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য জানানো হয়নি।

নিখোঁজদের সন্ধানের দাবিতে তাদের পরিবার ও সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় থানা, র‍্যাব কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

২০২৪ সালের ৬ আগস্ট, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন, নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা র‍্যাব সদর দপ্তরে গিয়ে তাদের সন্ধানের দাবি জানান।

পরে ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর ওয়ালীউল্লাহ, আল মুকাদ্দাস, জাকির হোসেন, জয়নাল আবেদীন, রেজওয়ান হুসাইন ও কামরুজ্জামানের পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়।

ছাত্রশিবিরের দাবি, গুমের পাশাপাশি গত দেড় দশকে তাদের অন্তত ১০১ নেতাকর্মী রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে নিহত হয়েছেন।

সংগঠনটির অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নেওয়ার পর অনেক নেতাকর্মীকে নির্যাতন করে পরে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে হত্যা করা হয়েছে। কারও কারও মরদেহ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে দাফন করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

এ ছাড়া রিমান্ডে নির্যাতন এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘শিবির’ তকমা দিয়ে হয়রানি ও হত্যার অভিযোগও করা হয়। এ প্রসঙ্গে বিশ্বজিৎ দাস ও বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ তুলে ধরা হয়।

প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত আইনের খসড়া নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে ছাত্রশিবির।

সংগঠনটির অভিযোগ, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গুমের মতো গুরুতর অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর রাখার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

ছাত্রশিবিরের ভাষ্য, যেসব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে গুম ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন কাঠামোর মধ্যে তদন্ত পরিচালিত হলে প্রকৃত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

সংবাদ সম্মেলনে ছয় দফা দাবি তুলে ধরে ছাত্রশিবির। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গুমের প্রতিটি ঘটনা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীর অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রের স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ, গুম ও হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন সংশোধন, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব কমান্ড কাঠামোর বাইরে স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনার পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীর পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এস