জোট গঠনের সময় এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জামায়াত। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাও প্রার্থী দেওয়ার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।

সংসদে প্রয়োজনীয় ভোট না থাকায় অলি আহমাদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী কি না, তা তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করায় জোট প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। জোটের নেতাদের মূল্যায়ন, এর মাধ্যমে একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করে সম্মান জানানো সম্ভব হবে।

রাজনৈতিক বার্তা দিতেই প্রার্থী

মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমালোচনা রয়েছে। জোটের নেতারা বলছেন, মুক্তিযোদ্ধা ও কওমি ঘরানার আলেমদের পাশে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও বিস্তৃত করাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

অলি আহমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ককেও গুরুত্ব দিচ্ছে জোটটি। নেতাদের মতে, অলি আহমাদকে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে সামনে আনা হয়েছে।

তবে ১১ দলীয় জোটের নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের চেয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, টানা সাতবার রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের হিসাব

সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের ৩৫০ জন সদস্য এই নির্বাচনের ভোটার।

আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে ভোট দেন। ব্যালট পেপারে প্রার্থীদের নামের পাশে স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্যের সদস্যপদ বাতিল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজ দলের প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ কার্যত সীমিত।

বর্তমান সংসদে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ৯০ জন এবং বিএনপির ২৪৭ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হতে প্রয়োজন ১৭৫ ভোট। ফলে সংসদীয় সংখ্যার হিসাবে বিএনপির প্রার্থীর জয় পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

আলোচনায় জুলাই জাতীয় সনদও

অলি আহমাদকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার বিষয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন গোপন ব্যালটে হওয়ার কথা। কিন্তু ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে প্রকাশ্য ভোটের বিধান রয়েছে।

তাঁর দাবি, বিএনপিসহ বিভিন্ন দল গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে একমত হলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১১ দল ও এনসিপি জুলাই সনদ অনুযায়ী নির্বাচন চায়। এই বিষয়টি সামনে আনাও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সর্বজনগ্রাহ্য প্রার্থী নিয়ে প্রশ্ন

রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করতে ১১ দলীয় জোটের বৈঠকে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, বিএনপি এমন কোনো প্রার্থী জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারেনি, যিনি সর্বজনগ্রাহ্য।

তাঁর মতে, সংস্কার প্রক্রিয়ার সময় রাষ্ট্রপতিসহ সাংবিধানিক পদগুলোতে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে ব্যক্তি নির্বাচনের প্রস্তাব ছিল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেই বিষয়টিও সামনে আনা হচ্ছে।

৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সুযোগ

১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেওয়ায় রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছিল। এখন পর্যন্ত সেটিই সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।

সেবার বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। জাতীয় পার্টির ৩৫ জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। অন্যদিকে জামায়াতের ১৮ জন সংসদ সদস্য বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলেন।

এরপর প্রায় ৩৫ বছর ধরে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এবার বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ায় দীর্ঘ সময় পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জয় নয়, রাজনৈতিক বার্তাই মুখ্য

পরাজয়ের সম্ভাবনা জেনেও কেন প্রার্থী দেওয়া হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের বীরবিক্রম, যোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করছেন।

তাঁর দাবি, দলীয় সংকীর্ণতার বাইরে গিয়ে রাজনীতি করাই তাঁদের লক্ষ্য। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চর্চা, জুলাই জাতীয় সনদ এবং সর্বজনগ্রাহ্য প্রার্থীর প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয়গুলো সামনে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এনএইচ