তিনি বলেছেন, ‘উলামায়ে কেরামকে শুধু মসজিদে ইমামতি, ওয়াজ-নসিহত কিংবা খুতবার মধ্যে নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। জাতির ক্রান্তিলগ্নে তাদের সঠিক পথনির্দেশনা, নেতৃত্ব ও আদর্শিক ভূমিকা পালন করতে হবে।’
শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি ভবনের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় উলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘মতবিরোধ নয়, ঐক্যেই গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’ স্লোগানে আয়োজিত এ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম। সম্মেলনে প্রস্তাবনা পেশ ও সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সেক্রেটারি ড. খলিলুর রহমান মাদানী।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘উলামায়ে কেরামের ইলম চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে কোরআন ও সুন্নাহ। আল্লাহর বিধান মানার পূর্ণাঙ্গ মডেল মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: ও তার আনুগত্যের বাস্তব মডেল সাহাবায়ে কেরাম। মুসলিম উম্মাহ এই আদর্শ অনুসরণ করলে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
তিনি বলেন, ‘ইসলামের কিছু বিষয় পালন করা সহজ এবং সেগুলো নিয়ে সমাজে আপত্তিও তুলনামূলক কম। কিন্তু বদর ও ওহুদের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে জুলুম ও বাতিলের বিরুদ্ধে সত্যের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো কঠিন।’
মক্কা জীবনে মহানবী সা: ও সাহাবায়ে কেরামের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘তারা প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি, বরং ধৈর্য ও ত্যাগের মাধ্যমে নিজেদের ঈমান ও চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করেছেন।’
মক্কা বিজয়ের ঘটনা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘দীর্ঘদিনের নির্যাতন-নিপীড়নের পরও মহানবী সা: মক্কাবাসীর জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। তবে নিরীহ মানুষ হত্যাসহ গুরুতর অপরাধে জড়িত কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্য থেকেও কয়েকজনকে নিরাপত্তা দেয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘ইসলামের ইতিহাসে প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমার দৃষ্টান্তই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে ব্যাপকভাবে কঠোর শাস্তি কার্যকর হবে— ইসলামের বিরুদ্ধে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে। অথচ মহানবী সা: ও সাহাবায়ে কেরামের শাসনামলে কতজনের ওপর হদ কার্যকর হয়েছিল, ইতিহাস থেকে তার তথ্য তুলে ধরতে হবে। মানুষ শুধু আইনের ভয়ে অপরাধ থেকে বিরত থাকত না; বরং আল্লাহর ভয় ও পরকালের জবাবদিহিতার বিশ্বাস তাদের নিয়ন্ত্রণ করত। মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি সৃষ্টি করা গেলে সমাজে অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব।’
উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইমাম যেমন নামাজে নেতৃত্ব দেন এবং মুসল্লিরা তাকে অনুসরণ করেন, তেমনি সমাজের মানুষও উলামায়ে কেরামের জীবন ও আমল অনুসরণ করবে। এজন্য উলামায়ে কেরামের সতর্কতার মাত্রা সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি হওয়া প্রয়োজন।’
বর্তমান সমাজে মানুষের সম্মান, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে উল্লেখ করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিশেষ করে নারীর নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে উলামায়ে কেরামকে সোচ্চার হতে হবে। সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় বলতে হবে।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘কোনো বার্তা, কোনো সমাজ পরিবর্তনের, কোনো সভ্যতা পরিবর্তনের সবচেয়ে নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারে উলামা শ্রেণীর মানুষেরা।’
ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, ইসলাম সম্পর্কে যে বিভ্রান্তি সমাজে ছড়ানো হচ্ছে, ফরিজায়ে একামাতে দ্বীনের ব্যাপারে এখনো মানুষের মধ্যে যে ভুল ধারণা আছে, এই সবকিছুর বেড়াজাল ছিন্ন করে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংগঠনটির সাবেক সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মা’ছুম বলেন, জুলাই সদন ও গণভোট অস্বীকার করা গণতন্ত্র পরিপন্থী স্বৈরাচারী মনোভাবের উত্থান। তাদের নেতা জাকাত নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে, দ্রব্যমূল্যে বাড়িয়ে হাসি-তামাশা করছেন। ছয় মাসের সরকার শুধু ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।’
আলেম সমাজকে ভিলেন বানানোর চেষ্টা চলছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরাম এখন ঐক্যবদ্ধ। আমরা কোনো ফ্যাসিবাদকে ভয় করি না এবং আমাদের যে আদর্শ রয়েছে তা দিয়ে দেশ চললে কারো কাছে হাত পাতা প্রয়োজন হবে না। যেদিন জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে দেখলে ঈশা আ:-এর হাওয়ারী আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের মতো দেখা যাবে তখন এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় কেউ বাধা দিতে পারবে না।’
সভায় কেন্দ্রীয় ওলামা কমিটির সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আব্দুল হালিম বলেন, ‘আগামী দিনের বাংলাদেশে মতানৈক্য নয়, ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এ দেশের আলেমরা দ্বীনের জন্য শহীদ হয়েছেন। তাদের রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে।’
জাতীয় উলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে ছয়টি প্রস্তাব পেশ করা হয়। প্রস্তাবগুলো হলো- ১. মাদরাসা ও কলেজে ইসলামী শিক্ষা সংকোচন বন্ধ করতে হবে। ২. মাদরাসার নারীশিক্ষার্থীদের ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের নির্দেশ প্রত্যাহার করতে হবে। ৩. উলামা-মাশায়েখদের হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। ৪. প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সঙ্গীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। ৫. ইবতেদায়ী মাদরাসা জাতীয়করণ করতে হবে। ৬. ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সার্ভিস রুল ও পে-স্কেল দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ৭. ফিলিস্তিন সকল জায়গায় মুসলিম হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।
এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ, মো: কামাল হোসেন এমপি, অধ্যাপক নুরুল আমিন এমপি, অধ্যক্ষ মাওলানা যায়নুল আবেদীন, মাওলানা তারেক মুনাওয়ার, মাওলানা আবু তাহের জিহাদী, ড. আব্দুস সামাদ, ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার, মাওলানা ইসমাইল হোসেন, মুফতি আলী হাসান ওসামা, মাওলানা মোশারফ হোসেন, ড. মিম আতিকুল্লাহ, অধ্যক্ষ লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, মাওলানা ফখরুদ্দিন আহমেদ, মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালি, মাওলানা বদরুল আলম, মুফতি নুরুজ্জামান নোমানী, মাওলানা হাবিবুর রহমান, অধ্যক্ষ মাওলানা মহিউদ্দিন, ড. মাওলানা নিজাম উদ্দিন, মাওলানা আব্দুল মোমিন নাসির, আবুল কালাম আজাদ আজহারী, সাদিকুর রহমান আজহারীসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম।
এস