বৃহস্পতিবার (৩ জুলাই) রাতে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের কাউন্সিল হলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের সাংগঠনিক থানা ও বিভাগীয় দায়িত্বশীল সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, চব্বিশের ছাত্র জনতা একক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। ফ্যাসিবাদের হাত থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে দুই সহস্রাধিক ছাত্র-জনতা জীবন দিয়েছে। ৫০ হাজারের অধিক আহত-পঙ্গু হয়েছে। ছাত্র-জনতা যেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে সেই বৈষম্য আবার সৃষ্টি হলে রাষ্ট্রকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। বৈষম্য সৃষ্টির উৎস হচ্ছে একক কর্তৃত্ব। জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বৈষম্যহীন কল্যাণ রাষ্ট্র জাতিকে উপহার দেবে। যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন ছিল আমাদের শহীদদের।

তিনি বলেন, জুলাইয়ে আত্মদানকারীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে এবং গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রবাসীরা। অথচ প্রবাসীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি জাতিকে দিয়েছে। তবে কোনো কোনো দলের কর্মকাণ্ডে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে হলে একদিকে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার প্রমাণ হবে, অপরদিকে জনপ্রতিনিধিত্ববিহীন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার দুর্ভোগ লাঘব হবে। সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদে জনপ্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় সরকারের সকল ক্ষমতা ডিসি-ইউএনওদের হাতে। ফলে জনগণকে আমলাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে। জনপ্রতিনিধি না থাকার সুযোগে স্থানীয় সরকারের সব স্তরে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। তাই জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার, গণহত্যার বিচারসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করে পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। এই দাবি জামায়াতে ইসলামীর একার নয়। এটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের এবং সর্বস্তরের জনগণের।

জাতীয় ঐক্যমত তৈরির পেছনে কঠিন ষড়যন্ত্র চলছে দাবি করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রাষ্ট্রের সংস্কারের জন্য এবং জাতীয় ঐক্যমত তৈরি করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেই উদ্যোগে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল একমত হয়ে সমর্থন জানালেও একটি দল বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। ফলে জাতীয় ঐক্যমত সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি নিজের ও দলীয় স্বার্থ পরিহার করে জাতীয় স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের পরিবারকে উপযুক্ত সম্মানী দিতে হবে, আহত-পঙ্গুত্ব বরণকারীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো ফ্যাসিবাদমুক্ত করার আন্দোলন করে সফল না হলেও ছাত্র-জনতা ফ্যাসিবাদের হাত থেকে জাতিকে মুক্ত করেছে। অথচ এখন কেউ কেউ লম্বা লম্বা কথা বলে, যারা আন্দোলনের কথা শুনলেই ফোন বন্ধ করে রাখত। তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামী জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায়, কারণ দলীয় সরকারের অধীনে কখনো কোনো নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়নি। তাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনও নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের প্রেরণা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের পক্ষে। নতুন করে যেই ঘাটতি বা ব্যত্যয় ঘটছে তা অচিরেই কেটে যাবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

তিনি বলেন, শহীদ ও আহত-পঙ্গুত্ব বরণকারীদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকে নতুন বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নিজেদের স্বার্থ পরিহার করতে হবে।

কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের পরিচালনায় সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।

অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আতিকুর রহমান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম প্রমুখ।

সভাপতির বক্তব্যে নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের যে স্বপ্ন জামায়াতে ইসলামী দেখে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে তিনি উপস্থিত নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, আগামীতে জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে জাতিকে বৈষম্যহীন কল্যাণ ও মানবিক রাষ্ট্র উপহার দেওয়া হবে। তিনি আসন্ন ১৯ জুলাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জাতীয় সমাবেশ সুশৃঙ্খলভাবে বাস্তবায়নে নেতাকর্মীদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমীর আবু মুসা, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকির, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি যথাক্রমে দেলাওয়ার হোসেন, মোহাম্মদ কামাল হোসেন, ড. আব্দুল মান্নান, মুহাম্মদ শামছুর রহমান, মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি যথাক্রমে মাহফুজুর রহমান, ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, মাওলানা ইয়াছিন আরাফাত প্রমুখ। এছাড়াও সম্মেলনে মহানগরী কর্মপরিষদ সদস্যবৃন্দ, থানা আমীর, বিভাগীয় সভাপতি, থানা নায়েবে আমীর, সহ সভাপতি, সেক্রেটারি ও সহকারী সেক্রেটারি, শ্রমিক কল্যাণ বিভাগের সকল থানা সভাপতি ও সেক্রেটারি, উলামা বিভাগের সকল থানা সভাপতি ও সেক্রেটারি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সকল থানা সভাপতি ও সেক্রেটারি, ছাত্রশিবিরের শাখা সভাপতি ও সেক্রেটারি, কেন্দ্রীয় ছাত্র প্রতিনিধিবৃন্দসহ মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

এনএইচ