প্রতিনিধিত্ব বা ওয়াকালাহ’র বিধান

ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী কোরবানি নিজ হাতেই করতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অন্য কাউকে নিজের পক্ষে পশুর ক্রয়-বিক্রয় বা জবাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ, যাকে ফিকহের পরিভাষায় ‘ওয়াকালাহ’ বলা হয়। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কোরবানি বুকিং মূলত এই ওয়াকালাহ প্রথারই একটি আধুনিক ডিজিটাল রূপ। ইমাম নববি (রহ.) ও ইবনে কুদামা (রহ.)-এর মতো বড় বড় ফিকহবিদগণ এই প্রতিনিধি নিয়োগকে জায়েজ বলেছেন।

অনুপস্থিত পশু ক্রয় ও ‘বায় বিল ওয়াসফ’

অনলাইনে পশু না দেখে কেনা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে। ইসলামি ফিকহে ‘বায় বিল ওয়াসফ’ বা অনুপস্থিত কোনো বস্তুর সঠিক বিবরণ (বয়স, ওজন, জাত ও স্বাস্থ্য) উল্লেখ করে কেনাবেচাকে বৈধ বলা হয়েছে। তবে হানাফি মাজহাবের ‘খিয়ারুর রুইয়াহ’ নীতি অনুযায়ী, পশুটি সরেজমিন দেখার পর যদি বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবের উল্লেখযোগ্য অমিল থাকে, তবে ক্রেতার চুক্তি বাতিল করার অধিকার রয়েছে।

ভাগাভাগি ও অংশীদারিত্বের সতর্কতা

অনেক অ্যাপে অপরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি পশুতে অংশীদার করে দেওয়া হয়। ফিকহের দৃষ্টিতে একটি পশুতে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন। তবে সবার নিয়ত হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। আলেমগণ সতর্কতার স্বার্থে পরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করাকেই সর্বোত্তম মনে করেন, যাতে অন্যের অবৈধ উপার্জন বা গলদ নিয়তের কারণে ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটে।

কোরবানির সময়সীমা ও জীবন্ত ওজন

অ্যাপের মাধ্যমে কোরবানি বুকিং দিলে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন জবাই ঈদের নামাজের পরেই সম্পন্ন হয়। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ঈদের দিনসহ তিন দিন এবং অন্যান্য মাজহাব অনুযায়ী ১৩ জিলহজ পর্যন্ত জবাই করা যায়। এছাড়া বর্তমানে প্রচলিত ‘লাইভ ওয়েট’ বা জীবন্ত ওজনের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণকে সমকালীন ফতোয়া বোর্ডগুলো বৈধ বলেছেন, কারণ এটি লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।

অ্যাপে বুকিং দেওয়ার আগে করণীয়

কেবল নিবন্ধিত ও সুনামসম্পন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করুন, পশু চূড়ান্ত করার আগে ভিডিও কলের মাধ্যমে সরাসরি দেখে নিন, প্রতিষ্ঠানের রিফান্ড ও বিনিময় নীতি আগেভাগে যাচাই করে নিন, কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর ছবি বা ভিডিও প্রমাণ সংগ্রহ করে রাখুন।

কোরবানির মূল প্রেরণা হলো তাকওয়া। আল্লাহ তাআলা কোরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন— ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ: ৩৭)। প্রযুক্তি মাধ্যম যাই হোক, নিয়ত ও শরয়ি বিধানের সঠিক পালনই হলো মূল লক্ষ্য।

এমএম