সাহাবিদেরও রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণের তাগিদ দিতেন। রজব মাস থেকেই রমজানপ্রাপ্তির দোয়া করা শুরু করতেন তিনি। প্রতিটি মুসলমানের উচিত, আল্লাহর কাছে নিজেদের পরিপূর্ণ নিবেদন করতে রমজানের আগেই যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করা। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মিম্বরে উঠলেন এবং বলেন, আমিন, আমিন, আমিন।
বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি মিম্বরে উঠছিলেন এবং বলছিলেন, আমিন, আমিন, আমিন। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই জিবরাইল আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি বললেন, যে রমজান পেল অথচ তাকে ক্ষমা করা হলো না, সে জাহান্নামে যাবে এবং আল্লাহ তাকে দূরে সরিয়ে দেবেন, বলুন আমিন। আমি বললাম আমিন।
যে তার মা-বাবা উভয়কে পেল অথবা তাদের একজনকে পেল অথচ তাদের মাধ্যমে সে পুণ্যের অধিকারী হতে পারল না এবং সে মারা গেল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহ তাকে দূরে সরিয়ে দেবেন, বলুন আমিন। আমি বললাম আমিন। যার কাছে আপনার নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে আপনার প্রতি দরুদ পাঠ করল না এবং মারা গেল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহ তাকে দূরে সরিয়ে দেবেন, বলুন আমিন। আমি বললাম আমিন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৫১)
পরিকল্পনা তৈরি করা
রমজান মাসটি কীভাবে কাটাবেন, তার একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। দিনের কোন সময় কী কাজ করবেন এবং রাত কীভাবে কাটাবেন—সব কাজের বিস্তারিত তালিকা ও সময়সূচি তৈরি করতে হবে।
মানসিক প্রস্তুতি
রমজান মাসের প্রতিটি রোজা রাখার জন্য আগে থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। নিজের জন্য প্রশান্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ঝামেলাপূর্ণ বিষয়গুলো আগে থেকেই এড়িয়ে চলতে হবে। ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করতে হবে। এ ছাড়া রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষার্থে সব ধরনের অনৈতিক অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও বিশ্বাসের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশা রেখে রমজানের রোজা রাখে, তার আগেরকার গুনাহ মাফ হয়ে যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৫)
শারীরিক প্রস্তুতি
রোজা রাখার জন্য শারীরিকভাবে সুস্থ থাকাও অত্যন্ত জরুরি। এসময় অসুস্থ হলে রোজা রাখাটাই কষ্টকর হয়ে যাবে। তাই শারীরিক অসুস্থতা থাকলে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে চিকিৎসা নিতে হবে। ডাক্তারের কাছ থেকে দরকারি পরামর্শগুলো নিতে হবে। ওষুধ থাকলে সেগুলো সাহরি ও ইফতারে খাওয়ার ব্যাপারে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।
প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন
প্রত্যেক মুসলমানের উচিত রমজান মাসের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মাসয়ালা-মাসায়েল আগ থেকেই জেনে নেওয়া। পবিত্র কোরআনের জ্ঞানার্জনে নিজেকে নিয়োজিত রাখা প্রয়োজন। যারা কোরআন বিশুদ্ধভাবে তেলাওয়াত করতে পারেন না, তারা তেলাওয়াত শিখতে পারেন। যারা কোরআনের তেলাওয়াত পারেন, তারা কোরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা পড়ায় সময় কাটাতে পারেন। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় বই পড়তে পারেন।
পারিবারিক প্রস্তুতি
পরিবারে সফলভাবে রমজান যাপনের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ আবশ্যক। পরিবারের সদস্যদের রমজানের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে রোজা নিয়ে কোরআনের নির্দেশনা, রোজার ফজিলতের হাদিস এবং এর বিভিন্ন উপকারিতা তুলে ধরে প্রতিদিন কিছু সময় ঘরোয়া তালিম হতে পারে। সবাই মিলে রমজানের একটি পারিবারিক রুটিন তৈরি করে নেওয়া দরকার।
জাকাত ও দানের প্রস্তুতি
রমজানে প্রত্যেক সওয়াব কাজের বিনিময়ে অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। রমজান ঘিরে মানুষের মধ্যে দান করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। রমজানের পূর্ব থেকেই সম্পত্তির হিসাব করে জাকাত দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। দান-সদকা করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানে বেশি বেশি দান করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল। রমজানে তার দানশীলতা (অন্য সময় থেকে) বেশি বাড়ত; যখন জিবরাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। জিবরাইল (আ.) রমজানের প্রতি রাতে আগমন করতেন এবং তারা পরস্পরকে কোরআন শোনাতেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) তখন প্রবাহিত বায়ুর চেয়ে অধিক দানশীল ছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬)
নারীদের প্রস্তুতি
রমজান আসার আগেই নারী-পুরুষের রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। তবে নারীদের পুরুষের চেয়ে ভিন্নভাবে রমজানের প্রস্তুতি নিতে হয়। প্রথমে তাদের কাজের তালিকা তৈরি করে নেওয়া উচিত। সাহরি-ইফতার তৈরি এবং বাসার অন্যান্য কাজের পাশাপাশি ইবাদতগুলো সঠিক ও দীর্ঘসময় ধরে কীভাবে করা যায়, তার একটি পরিকল্পনা তৈরি করা।
তওবা করা
রমজান আসার আগে থেকেই তওবা-ইস্তিগফার করা। গুনাহ ছেড়ে দেওয়া। পরিপূর্ণভাবে নিজেকে আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া। আল্লাহ তাআলা তওবা করার আদেশ দিয়ে পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা, তোমারা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো; যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)
এ ছাড়াও কাজের ফাঁকে নিজেকে বিভিন্ন ইবাদতে মশগুল রাখা যেতে পারে। মোবাইলে কোরআন শরিফসহ বিভিন্ন ইসলামিক অ্যাপস চালু করে তা কাজে লাগানো যেতে পারে। কোনোভাবেই রমজানের সময়গুলো অবহেলায় কাটানো যাবে না। সুচিন্তিত পূর্বপ্রস্তুতি নিতে পারলে রমজানকে আমল-ইবাদতে কাজে লাগানো আমাদের জন্য সহজ ও উপযোগী হবে।
এমএম