ইস্তেগফার ও তাওবা কী
ইস্তেগফার অর্থ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর তাওবা হলো গুনাহ থেকে ফিরে আল্লাহর আনুগত্যে ফিরে আসা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো; খাঁটি তাওবা।’ (সুরা তাহরিম: ৮)
আন্তরিক তাওবার চারটি শর্ত
১. গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া। অতীতের গুনাহের জন্য অন্তর থেকে অনুশোচনা করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘অনুতপ্ত হওয়াই তাওবা।’ (সুনান ইবনে মাজাহ: ৪২৫২
২. গুনাহ ছেড়ে দেওয়া। গুনাহ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি শুধু মুখে ক্ষমা চাইলে তাওবার এই শর্ত পূরণ হয় না। গুনাহের কারণ হয়ে ওঠা পরিবেশ ও অভ্যাস থেকে দূরে থাকার চেষ্টাও জরুরি।
৩. আর না করার দৃঢ় সংকল্প। ভবিষ্যতে ওই গুনাহে না ফেরার আন্তরিক সংকল্প থাকতে হবে। পরে দুর্বলতায় আবার গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে নতুন করে তাওবা করতে হবে।
৪. মানুষের হক ফিরিয়ে দেওয়া। কারও সম্পদ আত্মসাৎ করলে তা ফেরত দিতে হবে, ঋণ থাকলে পরিশোধ করতে হবে এবং কারও ওপর জুলুম করলে যথাসম্ভব প্রতিকার করে তার ক্ষমা নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। শুধু মুখে ইস্তেগফার এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।
যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
১. শুধু মুখে ইস্তেগফার করা: মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা উত্তম জিকির। তবে গুনাহ থেকে ফিরে আসার ইচ্ছা না থাকলে তাওবার মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। ইস্তেগফারের পাশাপাশি নিজের ভুল স্বীকার করা ও সংশোধনের চেষ্টা জরুরি। ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল।’ (সুরা নূহ: ১০)
২. তাওবা করতে দেরি করা: ‘পরে তাওবা করব’ এমন চিন্তা বিপজ্জনক। মৃত্যু কখন আসবে, তা কেউ জানে না। তাই গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত আল্লাহর কাছে ফিরে আসা উচিত। ‘হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা নূর: ৩১)
৩. একই গুনাহে পড়ে হতাশ হয়ে যাওয়া: তাওবার পর দুর্বলতায় আবার গুনাহ হয়ে গেলে আবার তাওবা করা এবং গুনাহ থেকে বাঁচার বাস্তব চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত। বারবার ভুল হওয়ার কারণে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া ঠিক নয়। ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা জুমার: ৫৩)
তবে তাওবার সময়ই গুনাহ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রাখা আন্তরিক তাওবার পরিপন্থী।
৪. গুনাহ প্রকাশ করে বেড়ানো: আল্লাহ যে গুনাহ গোপন রেখেছেন, তা অহেতুক মানুষের কাছে প্রকাশ করে বেড়ানো থেকে বিরত থাকা উচিত। রাসুলুল্লাহ (স.) এমন ব্যক্তিদের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন, যারা রাতের গুনাহ সকালে নিজেরাই প্রকাশ করে দেয়। (সহিহ বুখারি: ৬০৬৯)
তবে কারও অধিকার আদায়, জুলুমের প্রতিকার বা প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়ার জন্য বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে বিষয়টি জানানো আলাদা ব্যাপার।
আরও পড়ুন: তাওবা ও ইস্তেগফারের পার্থক্য কী? আস্তাগফিরুল্লাহ বললে তাওবা হবে?
৫. জুমার দিনের জন্য ভিত্তিহীন বিশেষ আমল বানিয়ে নেওয়া: সামাজিক মাধ্যমে কখনো প্রচার করা হয়, জুমার দিনে নির্দিষ্ট সংখ্যায় কোনো ইস্তেগফার পড়লে বিশেষ প্রতিদান পাওয়া যাবে। নির্ভরযোগ্য দলিল ছাড়া এমন নির্দিষ্ট সংখ্যা, পদ্ধতি বা ফজিলতকে সুন্নত হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
ইস্তেগফার যেকোনো দিন ও সময়ে করা যায়। রাসুলুল্লাহ (স.) নিজেও দিনে একশ বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। (সহিহ মুসলিম: ২৭০২) এই হাদিস নিয়মিত ইস্তেগফারের গুরুত্ব প্রমাণ করে, জুমার দিনের জন্য আলাদা কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করে না।
৬. শুধু জুমার দিনেই তাওবার কথা ভাবা: সহিহ হাদিসে জুমার দিনে এমন একটি সময়ের কথা এসেছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাইলে তিনি তা দান করেন। (সহিহ বুখারি: ৯৩৫) এই সময়টি ঠিক কখন, তা নিয়ে আলেমদের একাধিক মত রয়েছে।
তবে ইস্তেগফার ও তাওবা শুধু জুমার দিনের জন্য নির্দিষ্ট নয়। গুনাহ হয়ে গেলে যেকোনো সময় আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে হবে। জুমার দিনকে নিজের আমল পর্যালোচনা ও ভুল সংশোধনের উপলক্ষ বানানো যেতে পারে।
শেষ কথা, জুমার দিন বেশি বেশি ইস্তেগফার করুন, নিজের ভুল সংশোধন করুন এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না, আবার গুনাহকেও হালকাভাবে নেবেন না। আল্লাহ তাআলা আমাদের আন্তরিক তাওবা করার এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দিন। আমিন।
তথ্যসূত্র: সুরা নূহ: ১০; সুরা নূর: ৩১; সুরা তাহরিম: ৮; সুরা জুমার: ৫৩; সুনান ইবনে মাজাহ: ৪২৫২; সহিহ বুখারি: ৯৩৫, ৬০৬৯; সহিহ মুসলিম: ২৭০২
এমএম
















