নিউক্লিয়ার উইন্টার দেখতে কেমন তা কি আপনি দেখেছেন? সিনেমা নির্মাতা বা ঔপন্যাসিকদের কল্পনায় নিউক্লিয়ার উইন্টার মূর্ত হয়ে উঠেছে অনেক সময়। কিন্তু এবার এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন বিজ্ঞানীরা।
নতুন এক গবেষণায় আমেরিকার চারজন বায়ুমণ্ডল ও পরিবেশ বিষয়ক গবেষকের একটি দল নিউক্লিয়ার উইন্টারের একটি মডেল উপস্থাপন করেছেন। একটি ছোট অঞ্চলে মাঝারি আকারের নিউক্লিয়ার যুদ্ধ হলে সেখানকার অবস্থা কী হতে পারে তা দেখিয়েছেন তারা। এমনিতেই নিউক্লিয়ার যুদ্ধের পর যা হবে তার চিত্রটি অনেকটা এরকম- তাপমাত্রা হবে দুই থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস। বছরে বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাবে ৯ শতাংশ। আর এই দুটি ঘটনাই ফসল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। এর বিস্তারিত চিত্রটি দেখে নেওয়া যাক।
এই নিউক্লিয়ার যুদ্ধে যদি এক শোটি অ্যাটোমিক বম্ব ব্যবহার করা হয় তবে নিউক্লিয়ার উইন্টারের চিত্রটি বের হয়ে আসে। ইউএসএ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমায় যে আকারের বোম ফেলেছিল তার সমান বোমের কথা চিন্তা করা হয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এসব বোমের ওঅর হেড। মডেল তৈরিতে পাক-ভারতের মধ্যে নিউক্লিয়ার যুদ্ধের কথা বিবেচনা করা হয়েছে। মাঝারি আকারের যুদ্ধের কথা বিবেচনা করে এই দুই দেশকে বিবেচনায় আনা হয়েছে।
কারণ এই দুই দেশ ছোট আকারের নিউক্লিয়ার বোমের মালিক হয়েছে। তাদের মধ্যে নিউক্লিয়ার যুদ্ধ হয়ে গেলে তার চিত্র যেমন হবে-
১. পাঁচ মেগাটন ব্ল্যাক কার্বন বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে মুহূর্তের মধ্যে। পুড়ে অঙ্গার হওয়া জিনিস থেকে ব্ল্যাক কার্বন সৃষ্টি হয় এবং তা সূর্যের তাপ শোষণ করে নেয়। কিছু ব্ল্যাক কার্বন বৃষ্টির আকারে নেমে আসবে পৃথিবীতে।
২. এ ঘটনার এক বছর পর পৃথিবীর উপরিতলের গড় তাপমাত্রা ১.১ কেলভিন বা ২ ডিগ্রি ফারেনহাইট কমে যাবে। আর পাঁচ বছর পর দেখা যাবে, গোটা পৃথিবীর তাপমাত্রা এখনকার চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যাবে। বিশ বছর পর আমাদের এই আবাসস্থলের তাপমাত্রা আরো ১ ডিগ্রি কমে যাবে।
৩. ক্রমশই কমে যাওয়া তাপমাত্রার কারণে বৃষ্টিপাত বলতে কিছুই থাকবে না। যুদ্ধের পাঁচ বছর পর পৃথিবীতে স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টিপাত ৯ শতাংশ কমে যাবে। আর ২৬ বছর পর সাড়ে চার শতাংশ হারে বৃষ্টিপাত কমে যাবেন।
৪. যুদ্ধের ২ থেকে ৬ বছরের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলের ফসল উৎপাদনের মৌসুম ২০ দিন থেকে ৪০ দিন করে কমে যাবে।
৫. বায়ুস্তরে রাসায়নিক বিক্রিয়া ওজন স্তরকে খেয়ে ফেলবে। ওজন স্তর আমাদেরকে অতিবেগুনী রেডিয়েশন থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যুদ্ধের পাঁচ বছরের মধ্যে ওজন স্তর
২০ থেকে ২৫ শতাংশ পাতলা হয়ে যাবে। আর ১০ বছরের মধ্যেই ওজন স্তর ৮ শতাংশ পাতলা হয়ে যাবে।
৬. অতিবেগুনী রশ্মিকে আটকে দেওয়ার এই স্তর না থাকাতে আমাদের ত্বকে নানা ধরনের সমস্যা ও ক্যান্সার দেখা দেবে। সেইসঙ্গে উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং শস্যের ডিএনএ বিবর্তিত হয়ে যাবে।
৭. ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক পৃথক গবেষণায় বলা হয়, ১০০টি নিউক্লিয়ার বোমা ফেলা হয়েছে এমন একটি নিউক্লিয়ার যুদ্ধের পর ২ বিলিয়ন মানুষ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হবে।
বিজ্ঞানীদের এসব হিসাব-নিকাশের তালিকা দেখলে যেকোনো মানুষের অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে। মূলত ১৯৮৩ সালের দিকে মানুষের মাঝে 'নিউক্লিয়ার উইন্টার' এর ধারণাটি প্রচলিত হতে থাকে।
আজ ২৫ বছর পর পরিবেশ বিষয়ক বিজ্ঞানীরা আধুনিক জলবায়ু গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করে বোঝার চেষ্টা করছেন, নিউক্লিয়ার যুদ্ধের পর পৃথিবীর অবস্থা আসলে কেমন হতে পারে। এ ধরনের কয়েকটি মডেল ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। তবে যেখানে যে গবেষণাই হোক না কেনো, নিউক্লিয়ার উইন্টারের ছবিটি যে রক্ত হিম করে দেয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ঢাকা, ২১ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেআই





