শুনে আপনার রাগ হতে পারে, মনঃক্ষুণ্নও হতে পারেন। আপনাকে না জানিয়েই অনলাইনে আপনাকে নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আপনার আবেগ নিয়ে ফেসবুক এমন একটি গবেষণা করেছে। ফেসবুকের এই গবেষণার বিষয়টি নিয়ে অবশ্য আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ওয়েবের বিশাল জগতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের নিয়ে পরীক্ষা এখন মামুলি বিষয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টারনেটের ধাঁধার জগতে আমরা এখন শুধু পরীক্ষাগারের ইঁদুর, গিনিপিগের সঙ্গেও তুলনা করতে পারি নিজেদের।

ওয়েবের জগতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের নিয়ে সাধারণ যে পরীক্ষা চালানো হয় তাকে বলা হয় ‘এ/বি’ পরীক্ষা। অনলাইনভিত্তিক কোনো প্রতিষ্ঠান তাঁদের অল্প কিছু গ্রাহককে নিয়ে ভিন্ন ওয়েব অভিজ্ঞতা দেওয়ার কাজে এ ধরনের পরীক্ষা চালায়। আপনি যদি কোনো ‘এ/বি’ পরীক্ষার অংশ হয়ে যান তবে আপনার স্ক্রিনটি অন্যান্য ব্যবহারকারীদের চেয়ে ভিন্ন দেখবেন। আপনারা দুজন একই ওয়েবসাইটে থাকার পরও দুজন ভিন্ন ভিন্ন স্ক্রিন দেখতে পাবেন।

অনুসন্ধান সেবাদাতা গুগল প্রায়ই অনলাইনে ‘এ/বি’ পরীক্ষা চালায়। গুগলের সার্চ অ্যালগরিদমে সামান্য পরিবর্তন এনে তা ভালো ফল দেখাচ্ছে কিনা সেটি পরীক্ষা করতে এই পরীক্ষা করে গুগল। সংবাদ সংস্থা সিএনএনেরও ‘এ/বি’ পরীক্ষার জন্য একটি টুল রয়েছে যার মাধ্যমে খবরের বিভিন্ন শিরোনাম বদল করে কোনটিতে বেশি ক্লিক পড়ে বা বেশি পাঠককে আকৃষ্ট করা যায় তা দেখা হয়। সিএনএন ‘এ/বি’ পরীক্ষার এই টুলটির ব্যবহার করে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষও বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে নিউজ ফিডে কোন কনটেন্ট দেখানো হবে তা দেখতে ‘এ/বি’ পরীক্ষা চালায়।

আমরা জানি বা না জানি অনলাইনে পরীক্ষা চালানোর জন্য আমরা নিজেরাই কিন্তু অনুমতি দিয়ে থাকি। ওয়েবভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব পরীক্ষা করার জন্য হাতিয়ার হিসেবে রাখে তাদের নীতিমালা বা ইউজার পলিসি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফেসবুকের তথ্য ব্যবহারের নীতিমালার কথা। এই নীতিমালায় বলা হয়, ‘আপনার অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালী, ট্রাবলশুটিং, তথ্য বিশ্লেষণ, পরীক্ষা, গবেষণা ও সেবা উন্নত করতে সব ধরনের তথ্য ব্যবহার করতে পারব আমরা।’

তাহলে কী আমরা ফেসবুক বা কোনো অনলাইন সেবা বিনামূল্যে পাচ্ছি? নীতিমালা মেনে নেওয়া মানে আমরা বিনামূল্যে যে কনটেন্ট ও সার্ভিস পাই তারই দাম চুকানো। বিনামূল্যের সেবা নামে হলেও এর দাম হিসেবে আমরা আমাদের তথ্য ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে থাকি।

‘এ/বি’ পরীক্ষার ধরন অনুযায়ী সব সময়ই ফল পরিবর্তনযোগ্য। আপনি যদি কখনও এ ধরনের পরীক্ষার অংশ হয়ে থাকেন তবে আপনি এমনকিছুতে ক্লিক করতে বাধ্য হবেন যা অন্য সময় আপনি এড়িয়ে যেতেন। এ ধরনের পরীক্ষার মধ্যে পড়ে গেলে আপনি এমন কিছু করতে বাধ্য হবেন যা সাধারণত আপনি করেন না, আপনি এমন কিছু অনুভব করবেন যা অন্য কোনো সময় করতেন না। তবে প্রথাগত ‘এ/বি’ পরীক্ষা ও দুই বছর আগে করা ফেসবুকের ‘এ/বি’ পরীক্ষার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

অধিকাংশ ‘এ/বি’ পরীক্ষা দুটি উদ্দেশ্যে করা হয়। একটি হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এবং আরেকটি হচ্ছে ব্যবহারকারীর ওয়েব অভিজ্ঞতা আরও উন্নত করতে। একটি বাটন কোন স্থানে বসালে বেশি ক্লিক পড়বে এবং বেশি বিক্রি হবে সে হিসেবে ‘এ/বি’ পরীক্ষার ফল নিয়ে বাটন বসানো যায়। সার্চ ইঞ্জিনে আরও উন্নত অনুসন্ধান ফল দেখানো বা সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীকে বেশি সময় ধরে রাখাও এর উদ্দেশ্য হতে পারে।

অবশ্য ফেসবুক সম্প্রতি মানুষের আবেগ বোঝার জন্য যে পরীক্ষা চালিয়েছে তার উদ্দেশ্য পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এই পরীক্ষার সময় বেশ কিছু ফেসবুক ব্যবহারকারীকে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তুলনামূলকভাবে কম সুখী থাকতে হয়েছে। ২০১২ সালে এই পরীক্ষা করেছিল ফেসবুক। প্রায় ছয় লাখ ৯০ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের কারও কারও নিউজফিডে অধিক ইতিবাচক পোস্ট আবার কারও নিউজফিডে অধিক নেতিবাচক পোস্ট দেখানো হয়। ফেসবুকের এই পরীক্ষার ফলে অনেক ব্যবহারকারীর ওয়েব অভিজ্ঞতা আরও খারাপ হয়েছে।

এই পরীক্ষা সম্পর্কে ফেসবুকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কেবল ব্যবহারকারীদের কথা ভেবেই তা করা হয়েছে। গবেষণা প্রসঙ্গে ফেসবুকের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘আমরা আমাদের সেবা উন্নত করতে, প্রাসঙ্গিক কনটেন্ট দেখাতে ও ব্যবহারকারীকে আরও বেশি ফেসবুকের সঙ্গে যুক্ত রাখতে এই গবেষণা করেছি। গবেষণার বড় একটি অংশ ছিল বিভিন্ন ধরনের কনটেন্টের ক্ষেত্রে মানুষ কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটা জানা। ব্যবহারকারীর বন্ধুর পোস্ট করা কোনো খবর বা অনুসরণ করা পাতায় কোনো খবরে নেতিবাচক নাকি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া থাকে, সেটা জানার প্রয়োজনে এ গবেষণা।

সিএনএন জানিয়েছে, ফেসবুকের দাবি সত্য হলে তাদের উদ্দেশ্য অবশ্যই মহত্ কিন্তু তারা যে উপায়ে এটা করেছে সেটা অনৈতিক। মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করা ‘এ/বি’ টেস্টের একটি উদ্দেশ্যে হলেও ফেসবুকের করা পরীক্ষা ইচ্ছাকৃত । এতে মানুষকে জোর করে নেতিবাচক আবেগ ধরে রাখতে বাধ্য করা হয়েছে।

ভবিষ্যতে এ ধরনের পরীক্ষার চর্চা এড়িয়ে যাওয়াটা সহজ। ফেসবুক ও অন্যান্য ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহারকারীদের অনুমতি নেওয়ার জন্য ‘অপশন’ রাখতে পারে। যাতে কোনো গবেষণা করার আগে ব্যবহারকারী সে পরীক্ষায় অংশ নিতে চান কিনা সে নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে থাকবে। ছয় লাখ ৯০ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী যদি জানতেন তাঁরা ফেসবুকের মুড পরীক্ষার অংশ হতে যাচ্ছেন তবে ফেসবুককে এত সমালোচনার মুখে পড়তে হত না।

কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে ভাবনার বেশি কিছু নেই। সিলিকন ভ্যালির সংস্কৃতিই এমন যে জোর করে ব্যবহারকারীদের পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়ে পরীক্ষার ফল পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু আমরা এটুকু আশা করতে পারি যে ইন্টারনেটে আমাদের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো মানবকল্যাণে কাজ করছে আর আমরা ইতিবাচক কোনো পরীক্ষায় গিনিপিগ হয়ে ব্যবহূত হচ্ছি। সূত্র: সিএনএন।

ঢাকা, ৩ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেআই