বুধবার (২১ অক্টোবর) ত্রুটি দুটি সংশোধন করে পিএইচপির নতুন সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। তবে এরই মধ্যে এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হামলার চেষ্টা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এএফপি ও বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

যেসব দেশের ওয়েবসাইট বন্ধ

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) সতর্ক করে জানিয়েছে, দ্রুত নিরাপত্তাত্রুটি সংশোধন করা সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। সংস্থাটির আশঙ্কা, এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা সার্ভারের ফাইল সিস্টেম ও ডেটাবেজে অননুমোদিত প্রবেশ করতে পারে।

নেদারল্যান্ডসে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র, সরকারি পোর্টাল ওভারহেইড.এনএল, রটারডাম বন্দর, দেশটির জাতীয় ফুটবল সংস্থা কেএনভিবি, কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও হাসপাতালের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

ফিনল্যান্ডের সরকারি তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ভালতোরি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে সরকারি নেটওয়ার্কের ওয়েবসেবা বন্ধ করে দেয়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিরাপত্তা হালনাগাদ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের ওয়েবসাইটগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে।

ডেনমার্কের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কমবিটও কয়েকটি সেবা বন্ধ করেছে। এর মধ্যে দেশটির জাতীয় স্কুল যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাজ্যের এডিনবরা কাউন্সিলের ওয়েবসাইট এবং বিবিসির ‘ডক্টর হু’ ও ‘দ্য ট্রেইটরস’ অনুষ্ঠানের কয়েকটি ওয়েবপেজও পাওয়া যায়নি। তবে এসব ওয়েবসাইট বন্ধ হওয়ার সঙ্গে পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটির সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এআইয়ের সহায়তায় শনাক্ত নিরাপত্তাত্রুটি

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ ও উইজের গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত করেন। প্রতিষ্ঠান দুটির দাবি, দুর্বলতাগুলো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শনাক্তের বাইরে ছিল।

উইজ জানিয়েছে, উন্নত এআই মডেল ব্যবহার করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একাধিক অ্যাপ্লিকেশনের বিরুদ্ধে কার্যকর হামলার কৌশল তৈরি ও পরিবর্তন করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অনুমান, ইন্টারনেটের প্রায় ৭০ শতাংশ এসব ত্রুটির কারণে ঝুঁকিতে থাকতে পারে। তবে বিবিসি জানিয়েছে, এ পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ওপেনএআই এক ব্লগ পোস্টে বিষয়টিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সমস্যার একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হ্যাকাররা নির্দিষ্ট কোনো ওয়েবসাইটকে লক্ষ্য করার পরিবর্তে ইন্টারনেটজুড়ে পিএইচপির দুর্বল সংস্করণ ব্যবহার করা সার্ভার খুঁজে হামলা চালাতে পারে।

ঝুঁকিতে বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইট

ওয়েবসাইট তৈরিতে পিএইচপি বহুল ব্যবহৃত একটি প্রোগ্রামিং ভাষা। ওয়েব প্রযুক্তিবিষয়ক পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ডব্লিউথ্রিটেকসের তথ্য অনুযায়ী, যেসব ওয়েবসাইটের প্রোগ্রামিং ভাষা শনাক্ত করা যায়, তার প্রায় ৭৫ শতাংশে পিএইচপি ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া পিএইচপিনির্ভর ওয়ার্ডপ্রেস দিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪৩ শতাংশ ওয়েবসাইট পরিচালিত হয়।

ওয়ার্ডপ্রেস ছাড়াও দ্রুপাল, জুমলা ও ম্যাজেন্টার মতো প্ল্যাটফর্মে পিএইচপি ব্যবহার করা হয়। ফলে সরকারি পোর্টাল, সংবাদমাধ্যম, অনলাইন বিপণনব্যবস্থা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোফোসের কাউন্টার থ্রেট ইউনিটের বিশেষজ্ঞ ডন স্মিথ বিবিসিকে বলেন, হ্যাকারদের কাছে এ দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, শুধু নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করাই যথেষ্ট নয়; কোনো প্রতিষ্ঠানের কোন কোন ব্যবস্থায় পিএইচপি ব্যবহার হচ্ছে, তা শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ডেন কেইনেখট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, নিরাপত্তাত্রুটি কাজে লাগিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের হামলা শুরু হয়েছে। হামলার নতুন কৌশল সামনে আসায় প্রতিষ্ঠানটি তাদের ফায়ারওয়ালের সুরক্ষাব্যবস্থা হালনাগাদ করছে। তিনি এটিকে সাময়িক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা উল্লেখ করে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করার পরামর্শ দেন।

নিরাপত্তা হালনাগাদের আহ্বান

পিএইচপি কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার দুটি গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার কথা জানায়। বুধবার সেগুলো সংশোধন করে নতুন সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাজ্যের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ব্যবহারকারীদের দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করার আহ্বান জানিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র বলেছে, তাৎক্ষণিকভাবে ত্রুটি সংশোধন করা সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা পুরোপুরি সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (সিইআরটি-ইইউ) জানিয়েছে, এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়াই দূর থেকে কোড চালানো সম্ভব হতে পারে। এর মাধ্যমে ক্ষতিকর সফটওয়্যার ইনস্টল করা কিংবা ওয়েবসাইট অচল করে দেওয়ার মতো হামলা চালানো যেতে পারে।

সিইআরটি-ইইউর সতর্কতা অনুযায়ী, ২০০৪ সালে প্রকাশিত পিএইচপি ৫ থেকে পরবর্তী সংস্করণগুলোও ঝুঁকিতে থাকতে পারে। তবে ঠিক কোন কোন সংস্করণ আক্রান্ত, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। পিএইচপি ফাউন্ডেশন সাম্প্রতিক সংস্করণগুলোর জন্য সংশোধনী প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি পিএইচপি ৮.১ বা তার আগের সংস্করণ ব্যবহারকারীদের নতুন সংস্করণে উন্নীত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করার পাশাপাশি সার্ভারে আগে থেকেই অনুপ্রবেশ ঘটেছে কি না, তা পরীক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার, হোস্টিং পরিষেবা ও পিএইচপিনির্ভর অন্যান্য ব্যবস্থার নিরাপত্তাও নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি।

এস