সারা দিন নানা কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে স্মার্টফোনের ওপর দিয়ে চাপটাও যায় বেশি। ফোনে কথা বলা, ইন্টারনেট ব্যবহার করা, ছবি তোলা—সব কাজেই তো ভরসা ওই স্মার্টফোন। সঙ্গে বহনযোগ্য চার্জার না থাকলে রাতে ঘরে ফিরে চার্জ দিতে হয়।

সময়ের অভাবে অনেকে রাতে ফোনটি চার্জে রেখেই ঘুমিয়ে পড়েন, যাতে সকালে উঠে পুরোপুরি চার্জ হওয়া ফোনটা পাওয়া যায়। কিন্তু এটা কি ফোনের জন্য ভালো, না খারাপ?

আবার দেখা যায় মোবাইল ফোন চার্জ করতে দিয়ে অনেকেই কানে লাগিয়ে কথা বলেন বা গেম খেলেন বা ইন্টারনেট ব্রাউজ করেন। কিন্তু চার্জ দেওয়ার সময়ে ফোন ব্যবহার করাটা কি আদৌ নিরাপদ?

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, ভাল ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন আর ওই একই কোম্পানির চার্জার ব্যবহার না করলে বিপদের সম্ভাবনা অনেকটাই বেশি।

জরুরি খবর আদান-প্রদানের জন্য মোবাইল ফোনের জুড়ি নেই। বর্তমান যুগ হচ্ছে প্রযুক্তির যুগ। এখন যেন মোবাইল ছাড়া চলা দায়। মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মধ্যে মোবাইল অন্যতম।

তবে এই মোবাইল ব্যবহারে যেমন সুফল রয়েছে তেমনি রয়েছে কুফল। কারণ মোবাইল ফোন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন আসক্তি ছাড়াচ্ছে। এছাড়া ছোট শিশুরাও মোবাইল ফোন ছাড়া খেতে চায় না।

অনেক ঘটনার কথাই জানা যায়, যেখানে মোবাইল ফোন বিস্ফোরণে কারও মৃত্যু হয়েছে অথবা কারও শরীরের কোনও অংশ ঝলসে গেছে।

গত সপ্তাহে এরকমই এক ঘটনা ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুর শহরে। রিয়া ব্যানার্জী নামে ২২ বছরের এক তরুণী মোবাইলে চার্জ দেওয়ার সময়েই কথা বলছিলেন। হঠাৎই বিস্ফোরণ ঘটে। অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার মৃত্যু হয়।

দমকল বাহিনী বলছে, ওই তরুণী যে বিছানায় বসে কথা বলছিলেন মোবাইল ফোন চার্জে দিয়েই, সেই বিছানাও কিছুটা পুড়ে গেছে। ঘর থেকে ফেটে যাওয়া মোবাইল, চার্জার এসব উদ্ধার করা হয়েছে।

ঘটনার পরেই মিজ. ব্যানার্জীর বাড়িতে গিয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা অভিজিত দাস।

তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, "হঠাৎই বিস্ফোরণের শব্দ পাই। মেয়েটি চিৎকারও করছিল। ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখি মেয়েটি অনেকটা পুড়ে গেছে। বিছানাতেও আগুন লেগে গিয়েছিল। মোবাইলেই যে বিস্ফোরণ হয়েছে, সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। পাশেই চার্জারের কেবলও পড়ে ছিল।"

যে স্থানীয় সাংবাদিকরা সেখানে গিয়েছিলেন, তাদের একজন বলছিলেন, "আমরা যখন ফেটে যাওয়া মোবাইলটার ছবি তুলছিলাম, তখনই খেয়াল করি যে ওটা কোন নামী ব্র্যান্ডের সেট ছিল না। স্ক্রিনটাও ফেটে গিয়েছিল। মোবাইলের সঙ্গেই একটা লাল রঙের চার্জিং কেবল যুক্ত ছিল। সেই তারের আবার দুটো জায়গায় লিউকোপ্লাস্ট জড়ানো।"

সন্দেহ করা হচ্ছে, চার্জ দেওয়ার সময়ে কোনও ভাবে বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট হয়ে বিস্ফোরণ ঘটেছে। আর যেহেতু সেই সময়ে মিজ. ব্যানার্জী মোবাইলে কথা বলছিলেন, তাই সেটি ছিল কানের সঙ্গে লাগানো। তাতেই বিস্ফোরণের আঘাত অনেকগুণ বেড়ে গেছে।

মিজ. ব্যানার্জীর ঘটনাই প্রথম নয়। ২০০৪ আর ২০০৫ সালে এরকম দুটি ঘটনার কথা জানা যাচ্ছে, যেখানে ফোনে চার্জ দেওয়ার সময়ে তড়িতাহত হন এক ভারতীয় এবং এক নাইজেরীয় নাগরিক। ২০১৩ সালে এক চীনা বিমানসেবিকা যখন তার ফোনে চার্জ দেওয়ার সময়ে একটি কল রিসিভ করেন, সেটি ফেটে গিয়ে তার মৃত্যু হয়।

চীনে ২০১৩ সালে ওয়াং কাই নামের এক যুবক জানান, তিনি যখন ঘুমিয়ে ছিলেন তখন তার ফোন বিস্ফোরিত হয়ে সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। এই ঘটনায় তার বিছানার কিছু অংশও পুড়ে যায়। এসময় ফোনটি চার্জে দেওয়া ছিল না বলেও তিনি জানান। স্থানীয় পুলিশ বলেছিল, ফোনটির ত্রুটির কারণে এরকম হয়ে থাকতে পারে।

ইউ এস কনজিউমার প্রোডাক্ট সেফটি কমিশন বলছে, ২০১২ থেকে ২০১৭ সালে মোবাইল ফোনের ব্যাটারি আর চার্জারের কারণে ২,০০০ দুর্ঘটনা তারা নথিবদ্ধ করেছে।

এর মধ্যে যেমন রয়েছে আগুন লেগে যাওয়া, অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া, গলে যাওয়ার ঘটনা, তেমনই আছে ফোন থেকে ধোঁয়া বের হওয়া আর বিস্ফোরণের ঘটনাও।

প্রযুক্তিবিদদের ব্যাখ্যা, মোবাইল ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতেই পারে। কিন্তু তাপমাত্রা খুব বেড়ে যাওয়ার আগেই মোবাইলে এমন কয়েকটি সুরক্ষা কবচ থাকে, যা চূড়ান্ত তাপমাত্রায় পৌঁছতেই দেয় না।

মোবাইল ফোন বিস্ফোরণ কেন হয়?

মোবাইল ফোন চার্জ দেয়া অবস্থায় কথা বললে বিস্ফোরণ হতে পারে। মনে রাখবেন মোবাইল ফোনের ব্যাটারিই একমাত্র বিস্ফোরকের মতো। মোবাইল ফোনের ব্যাটারি চার্জ নেওয়ার সময় পাওয়ার কনজিউম করে। এ সময় যদি কথা বলা হয় তবে পাওয়ার কনজাম্পশন আরও বেড়ে যায়।তাই ব্যাটারি অতিরিক্ত তাপ সইতে না পেরে বিস্ফোরণ ঘটায়।

এছাড়া ব্যাটারি যদি নিন্মমানের হয়, ম্যাটেরিয়াল, কন্ট্রোল এবং শর্টসার্কিটের কারণে বিস্ফোরণ হতে পারে।

মোবাইল ফোন বিস্ফোরণ থেকে বাঁচতে কী করবেন?

মোবাইল ফোন বিস্ফোরণ থেকে বাঁচতে আমাদের কিছু করণীয় রয়েছে। আসুন জেনে নেই মোবাইল ফোন বিস্ফোরণ থেকে বাঁচতে কী করবেন?

১. মোবাইল চার্জ দেওয়ার জন্য উন্নতমানের অথবা সার্টিফায়েড চার্জার ব্যবহার করুন।

২. ঘুমাতে যাওয়ার আগে মোবাইল ফোন চার্জে দেবেন না।মোবাইল চার্জে দিয়ে ঘুমাতে যাওয়া বিপজ্জনক। এতে মোবাইলের ক্ষতি হয় ও বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

৩. ফুটপাতের পাওয়ার ব্যাংক ব্যবহার করবেন না। এ ধরনের পাওয়ার ব্যাংক মোবাইলের ব্যাটারি নষ্ট করে দিতে পারে। ঘটাতে পারে বিস্ফোরণ।

৪. অনেক সময় ধরে রোদে মোবাইল ফেলে রাখবেন না। এতে বিস্ফোরণ ঘটনার সম্ভবনা রয়েছে।

৫.নিম্নমানের ব্যাটারি ও ফোনে চার্জ দেয়া অবস্থায় কথা বলা বা ইন্টারনেট ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

এক বিখ্যাত মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারী কোম্পানির একজন সিনিয়র প্রযুক্তিবিদ, যিনি তার নাম প্রকাশ করতে চাননি, বলছিলেন, "যে সুরক্ষা কবচ আমাদের মতো কোম্পানির মোবাইলে থাকে, তাতে বিস্ফোরণ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। তবে চার্জ হওয়ার সময়ে মোবাইল কিছুটা গরম হয়েই থাকে। তবে সেটা থেকে বিপদের সম্ভাবনা থাকে না বড় ব্র্যান্ডের ফোনে।"

"কিন্তু সস্তা ও অনামী যেসব ব্র্যান্ড আছে, তারা হয়তো এরকম সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখে না। আবার যে কোম্পানির ফোন, তাদের সরবরাহ করা চার্জার ব্যবহার না করে সস্তার কোনও চার্জার ব্যবহার করলেও, এরকম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।"

মোবাইল ফোনের যত্রতত্র ব্যবহারের ফলে মোবাইল ফোন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। এত অনেকের মৃত্যুও ঘটে। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল চার্জে দিয়ে কথা বলেন। মোবাইল ফোন চার্জ দেয়া অবস্থায় কথা বললে বিস্ফোরণ হতে পারে। নিম্নমানের ব্যাটারি ও ফোনে চার্জ দেয়া অবস্থায় কথা বলা বা ইন্টারনেট ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

এএস