ধূমকেতু ৬৭পি বা চুরিয়মোভ-গেরাসিমেনকোর পৃষ্ঠে অবতরণ করেছে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির (ইসার) নভোযান রোসেটা।

বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে ধূমকেতুটির গায়ে নামল রোসেটার ল্যান্ডার রোবট ফিলায়ে।

২০০৪ সালে রোসেটা মহাকাশযান পৃথিবী ছেড়ে চুরিয়মোভ ধূমকেতুর উদ্দেশে রওনা হয়।

প্রায় ৬৫০ কোটি কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চুরিয়মোভের ধূমকেতুতে পৌঁছায় রোসেটা।

আর এরই মধ্য দিয়ে ‘অন্য এক উচ্চতায়’ উঠল মানুষ। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো ধূমকেতুর গায়ে নামানো গেল মনুষ্যনির্মিত যান।

ইসার মহাসচিব জ্যাঁ জ্যাকেস ডরডেইন বলেছেন, ‘এটা মানব সভ্যতার জন্য বড় এক পদক্ষেপ।’

জার্মানির ডার্মস্ট্যাড থেকে যে বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা রোসেটা এবং ফিলায়েকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, তারা এই ঘটনাকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন।

নিয়ন্ত্রণকক্ষে কর্মরত বিজ্ঞানীরা করতালি ও পরস্পরকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে উদযাপন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চুরি ধূমকেতুটির অন্যতম আবিষ্কারক ক্লিম চুরিয়মোভও।

জার্মান স্পেস এজেন্সির (জিএসএ) বিজ্ঞানী স্টিফেন উলামেক, যিনি ফিলায়ে অবতরণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছেন; তিনি বলেছেন, ‘ফিলায়ে আমাদের উড়িয়ে নিয়ে গেল...আমরা এখন ধূমকেতুতে।’

চুরিয়মোভ-গেরাসিমেনকোর ধূমকেতুটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৫১ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে।

পৌছানের মাত্র ২২ কিলোমিটার বাকি থাকতে ওপর থেকে রোসেটা থেকে ফিলায়ে রোবটটিকে ছেড়ে দেওয়া হয় ৭ ঘণ্টা আগেই। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে রোসেটা থেকে পৃথক হয় ফিলায়ে। অত্যন্ত শ্লথগতিতে তা নামতে থাকে চুরিয়মোভের পৃষ্ঠের দিকে।

ইসার বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে ‘৭ ঘণ্টার শঙ্কা’ বলে অভিহিত করেন। ঠিক যেমনটা ২০১২ সালে মঙ্গল গ্রহে কিউরিওসিটি রোভার অবতরণের ঘটনাকে নাসা অভিহিত করেছিল ‘৭ মিনিটের শঙ্কা’ বলে।

৭ ঘণ্টার স্লো-মোশন অভিযান শেষে চুরিয়মোভ পৃষ্ঠে নেমেছে ফিলায়ে। ছোঁয়ামাত্রই ড্রিলার দিয়ে খনন শুরু করে ফিলায়ে।

পাশাপাশি ক্যামেরা দিয়ে তাৎক্ষণিক কয়েকটি ছবি তোলে। চুরিয়মোভ থেকে সেই ছবি বেতারমাধ্যমে পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের হাতে এসে পৌঁছে ১০টা ৫ মিনিটের দিকে (এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত সময়গুলো বাংলাদেশ মানে দেওয়া হচ্ছে)।

উল্লেখ্য, ফিলায়ে রোবটের ওজন ১০০ কেজি। এর ভেতর আছে একটি ড্রিলার এবং ৯টি যন্ত্র। অবতরণের আগে স্টিফেন উলামেক যেমনটা বলেছেন, ‘ওই ড্রিলারটা এবং ফিলায়ের পায়ে লাগানো স্ক্রুগুলোর ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে এবং চুরিয়মোভের পৃষ্ঠ কতটা নরম সেটার দিকেও তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে আমাদের। এটা যে সহজ কাজ নয়, তা নিশ্চিত।’

বরং কিউরিওসিটির চেয়ে ফিলায়ের বেলায় শঙ্কাটা আরও বেশি ছিল। কারণ মঙ্গলের পৃষ্ঠ ছিল অধিক মসৃণ। আর চুরির পৃষ্ঠ বরফ আচ্ছাদিত ও পাথুরে, মানে অনেক বেশি এবড়ো-থেবড়ো। এর পর মহাকর্ষ টান তুলনামূলক অনেক হালকা। ফলে বাউন্স করে রোবটটি মহাশূন্যে ফিরে যাওয়ারও শঙ্কা ছিল।

রোবট ফিলায়ের তোলা চুরিয়মোভের ছবি বিশ্লেষণ করে ধূমকেতুটির প্রকৃতি উন্মোচনের চেষ্টা করবেন বিজ্ঞানীরা। এরই মধ্য দিয়ে আমরা সৌরজগতের জন্মরহস্য সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারি। ফলে পৃথিবী কেন একমাত্র প্রাণ-অধ্যুষিত গ্রহ, সে রহস্যের জটও কিছুটা খুলে যাবে।তথ্য সহায়তা : ইসা ও বিবিসি

ইআর