নজিরবিহীন কমমূল্যে বাংলাদেশের ইন্টারনেট ইতালিতে বিক্রির বিষয়ে চুক্তি অনুমোদন করেছে সরকার। অব্যবহৃত ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের একটি বড় অংশ বিক্রির এই চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের ইন্টারনেট বাংলাদেশের মানুষের চেয়ে প্রায় ৬৬ ভাগ কমমূল্যে ব্যবহারের সুযোগ পাবেন ইতালির মানুষ।
এমনকি যথাযথ দরপত্র আহবান না করেই এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের কোন ধরনের সুযোগ না দিয়ে এই ব্যান্ডউইথ বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানা গেছে। ইংরেজি জাতীয় দৈনিক দি ডেইলি স্টারের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
সরকার নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশ সাবমেরিক ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) সেকেন্ডে ৫৭ গিগাবাইট স্পিডের ব্যান্ডউইথের ওই ইন্টারনেটের চালান ইতালিয়ান কম্পানি “ইতালিয়া স্পার্কেলস”-এর কাছে বিক্রির জন্য সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন পেয়েছে। সাবমেরিন ক্যাবলের প্রান হিসেবে বিবেচিত ওই ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৯.৭৭ কোটি টাকা যার মেয়াদ হবে পনের বছর।
এভাবে ব্যান্ডউইথ বিক্রি করা হলে সেকেন্ড-প্রতি এক এমবিপিএস স্পিডের ইন্টারেনেটের মাসিক মূল্য দাঁড়ায় মাত্র ৯.৫২টাকা। অথচ এই পরিমান ইন্টারনেটের জন্য বাংলাদেশের মানুষকে এক মাসে খরচ করতে হয় ৬২৫ টাকা। সেই হিসেবে বাংলাদেশের মার্কেটেও যদি ৫৭ গিগাবাইট স্পিড দিয়ে এই ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ বিক্রি হয় তাতেও মোট মূল্য দাঁড়ায় ৬৪১.২৫ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মতে এমন নজিরবিহীন কম দামে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ বিক্রির বিএসসিসিএলের এই উদ্যোগ কিছুতেই গ্রহনযোগ্য নয়।
পনের বছরের জন্য এত কম মূল্যে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ বিক্রি করে সেটা রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ এক বছরের জন্য বিএসসিসিএল অবশ্য অতিরিক্ত মূল্য পাবে যার পরিমান দাঁড়ায় ৪.৪ কোটি টাকা। কিন্তু তার জন্যও ক্যাবলের ওপর থেকে বাংলাদেশ তার কর্তৃত্ব হারাবে।
সরকারি মালিকানাধিন এই বিএসসিসিএল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনোয়ার হোসেন অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটা লোকসানই মনে হয়। কিন্তু এই বিশাল পরিমানের ইন্টারনেট যেহেতু অব্যবহৃত রয়ে যাচ্ছে। তাই এই চুক্তির মাধ্যমে যতটুকু আয় করা যাবে ততটাই আমাদের জন্য লাভ।
অনুমোদিত এই ব্যান্ডউইথের মূল্য আন্তর্জাতিক মানদন্ডে গ্রহণযোগ্য বলেও দাবি করেন মনোয়ার হোসেন।
এদিকে, প্রাইভেট কোম্পানি “ফাইবার এড হোম লিমিটেড”-এর প্রধান স্ট্রাটেজি কর্মকর্তা সুমন আহমেদ সাবির বলেন, এই ধরনের মূল্য অবিশ্বাস্য। আমরা এই দামে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ কিনতে যে কোন সময় প্রস্তুত রয়েছি। রপ্তানির নামে বিদেশে এমন দামে ইন্টারনেট বিক্রি করার কোন দরকার নেই।
তিনি আরও বলেন, এই সুযোগ যদি বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের দেয়া হয় তাহলে দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের আরও বেশি স্পিডি ইন্টারনেট সেবা কম মূল্যে দেয়া যাবে।
ব্যান্ডউইথ বিক্রির এই প্রক্রিয়ায় বিএসসিসিএল দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেছে বলেও অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। তারা বলেন, ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্যে ৯.৩৬ কোটি টাকায় এক বছরের জন্য ১০ জিবিপিএস স্পিডের ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রপ্তানির জন্য বাংলাদেশ এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অথচ এখন তারা ১৫ বছরের জন্য ৫৭ জিবিপিস স্পিডের ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ বিক্রির জন্য মাত্র ৯.৭৭ কোটি টাকার চুক্তি করতে যাচ্ছে।
বিএসসিসিএল-এর এমডি মনোয়ার হোসেনের অবশ্য দাবি, ইতালিতে ব্যান্ডউইথ বিক্রির সাথে ভারতের সাত অঙ্গরাজ্যে ব্যান্ডউইথ বিক্রির চুক্তি সম্পূর্ণ আলাদা। ইতালির সাথে চুক্তির মধ্য দিয়ে মূলত কানিকটিভিটি বিক্রি করা হবে। অপরদিকে, ভারতে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি চুক্তিতে ব্যাকহোল ও ট্রান্সমিশন চার্জসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক বিষয়াদি সংযুক্ত রয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সাবেক সভাপতি মোস্তফা জব্বার বলেন, ব্যান্ডউইথ রপ্তানির নাম করে আমরা প্রায় ফ্রিতে তা বিদেশীদের দিয়ে দিতে পারি না। যদি এটা করতেই হয় তাহলে আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের এই সুযোগ দিতে পারি। এতেই বরং আমাদের দেশ ও দেশের অর্থনীতি সরাসরি লাভবান হবে।
বর্তমানে ২০০ জিবিপিএস ইন্টারনেট স্পিড প্রদানে সক্ষম সরকারি বিএসসিসি’র কাছ থেকে মাত্র ৩৩ জিবিপিএস স্পিডের ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সেবা পেয়ে থাকেন দেশবাসী। আর এক্ষেত্রে বাড়তি ১৩৬ জিবিপিএস চাহিদা মেটাতে দেশে দাম বেশি এমন কারণ দেখিয়ে ভারতের ছয়টি কোম্পানির কাছ থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানি করা হচ্ছে।
এমনই বাস্তবতায় অব্যবহৃত ব্যান্ডউইথ অবিশ্বাস্য কম দামে ইতালিতে রপ্তানি না করে এজন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহবান করার পরামর্শ দিলেন প্রাইভেট মালিকানাধিন নোভোকম লিমিটেডের প্রধান মার্কেটিং কর্মকর্তা মো: হাসিবুর রশিদ।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
উল্লেখ্য, ইতালিতে এমন নজিরবিহীন কমদামে অব্যবহৃত ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ বিক্রির জন্য বিএসসিসিএলের প্রস্তাবটি গত ২৩শে আগস্ট (২০১৫) অনুমোদিত হয়। তবে, এ বিষয়ে এখনো কোন চুক্তি হয়নি।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও একবার এই ইটালিয়া স্পার্কেলস কোম্পানিটি মাত্র ১৬ কোটি টাকায় ৯০ জিবিপিএস স্পিডের ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ক্রয়ের জন্য বাংলাদেশের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে, সরকার সেই প্রস্তাব নাকোচ করে দেয়।
পরে গত জুনে (২০১৫) ইটালিয়া স্পার্কেলস চুক্তিটি সংশোধন করে এক বছরের জন্য ১০ জিবিপিএস স্পিডের ব্যান্ডউইথ ক্রয়ের প্রস্তাব দেয়। এতে মাস প্রতি ১৪ হাজার ডলার বা প্রায় ১১ লাখ ২০হাজার টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
টেলিকম বিভাগের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ সরকার এই চুক্তির ব্যাপারে অনুমোদন প্রদান করে। কিন্তু ইটালিয়া স্পার্কেলস পরে এ ব্যাপারে আর অগ্রসর হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ২০০৬ সালে ৬৩ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সাবমেরিন ক্যাবল বা (SEA-ME-WE-4) প্রকল্পের সাথে প্রথম সংযুক্ত হয়। মাত্র তিন বছরেই বিএসসিসিএল এই অর্থ তুলে নিতে সক্ষম হয়। আর এখন যা আয় হচ্ছে তা পুরোটাই লাভ।
বিএসসিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ার হোসেন আরও জানান, আগামী দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলের দ্বিতীয় প্রকল্প বা (SEA-ME-WE-5)-এর সাথে যুক্ত হতে যাচ্ছে। আর তখন অতিরিক্ত ১৩০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ইন্টারনেট সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। “তখন আমাদের কোন ব্যান্ডউইথ ঘাটতি থাকবে না”।
মনোয়ার হোসেন বলেন, আগামীতে জাপানি কোম্পানি নিপ্পন টেলিগ্রাফ ও ভারতীয় কোম্পানি ভারতি এয়ারটেলের নিকট ২০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথের ইন্টারনেট বিক্রির পরিকল্পনা চলছে।
এমনকি পাহাড়বেষ্টিত নেপাল এবং ভুটানেও ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রপ্তানির পরিকল্পনা বাংলাদেশের রয়েছে বলেও জানান ইন্টারনেট তদারকিতে নিয়োজিত সরকারি সংস্থা বিএসসিসিএলের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
কেবি





