একই আদেশে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমানকে চলতি দায়িত্বে চট্টগ্রামের নতুন সিভিল সার্জন হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।

বুধবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পার-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়। যুগ্মসচিব সাইফুল ইসলামের সই করা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, জনস্বার্থে ও দাপ্তরিক প্রয়োজনে এ আদেশ জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের আগামী ২৪ আগস্টের মধ্যে নিজ নিজ নতুন কর্মস্থলে যোগদান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর ও যোগদান সম্পন্ন না করলে ২৫ আগস্ট থেকে তারা বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য হবেন।

নিয়োগে তুঘলকি কান্ড ও এসএমএস জালিয়াতি

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলার সিভিল সার্জন হিসেবে পদায়ন করা হয়েছিল। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য সহকারীসহ ৩য় ও ৪থ শ্রেণির মোট ১৭১টি শূন্য পদের নিয়োগ পরীক্ষা। এই নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করেই মূলত তার বিরুদ্ধে প্রথম বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে।

পরীক্ষার শুরু থেকেই চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে পছন্দের প্রার্থীদের আগেভাগেই ওএমআর শিট পূরণের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার নীলকশ তৈরি করা হয়। সাধারণ পরীক্ষার্থীদের বড় অংশকে পরীক্ষা শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, কিংবা অনেকের ক্ষেত্রে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর প্রবেশপত্রের এসএমএস পাঠানো হয়েছিল—যাতে তারা সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারেন।

সবচেয়ে বড় বিস্ময় সৃষ্টি করে ফল প্রকাশের গতি। পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার পরীক্ষার্থীর ওএমআর মূল্যায়ন সম্পন্ন করে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। তড়িঘড়ি করে মাঝরাতে ফলাফল প্রকাশের এই ঘটনাকে 'নজিরবিহীন ও সাজানো' বলে আখ্যায়িত করেন সাধারণ পরীক্ষার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফলাফল শিটের ছবি ও অসঙ্গতি প্রকাশ পাওয়ার পর চট্টগ্রামজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।

কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও 'আপস' বৈঠক

নিয়োগ দুর্নীতির আগ থেকেই অবশ্য জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর প্রশাসনিক দক্ষতা ও সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। সম্প্রতি সিভিল সার্জন কার্যালয়েরই এক চতুর কর্মচারীর বিরুদ্ধে সিভিল সার্জনের নাম ভাঙিয়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ ও অর্থ আদায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ওই কর্মচারী বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালে পদোন্নতি, বদলি এবং সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

বিষয়টি জনসমক্ষে জানাজানি ও চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য খাতে তুমুল সমালোচনার ঝড় তুললে অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে কার্যালয়ের ভেতরেই রুদ্ধদ্বার 'আপস-মীমাংসা'র উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বয়ং সিভিল সার্জনের উপস্থিতিতে ও ছায়াতলে অর্থ লেনদেনের এই কথিত সমঝোতা বৈঠক কার্যালয়ের ভেতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও চরম অসন্তোষের জন্ম দেয়। এ ঘটনায় সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলমের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে গুঞ্জন জোরালো হয়।

লাইসেন্স ও নবায়ন বাণিজ্যের জিম্মিদশা

শুধু সরকারি নিয়োগ বা কর্মচারী কেলেঙ্কারিই নয়, চট্টগ্রামের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতকেও দীর্ঘদিন জিম্মি করে রাখার অভিযোগ রয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রামের শত শত বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল, ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নতুন লাইসেন্স প্রদান এবং পুরনো লাইসেন্স নবায়নকে আয়ের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

লাইসেন্স পাওয়ার আইনগত শর্ত পূরণ থাকা সত্ত্বেও মাসের পর মাস ফাইল আটকে রেখে মোটা অঙ্কের নজরানা দাবি করা হতো বলে একাধিক ক্লিনিক মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে, প্রভাবশালী বা অর্থ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মকানুন বা মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই রাতারাতি লাইসেন্স অনুমোদন কিংবা নবায়ন করে দেওয়া হতো। চট্টগ্রাম নগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে ওঠা ভুঁইফোড় ও অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর অভিযান না চালিয়ে উল্টো মাসোহারা তোলার গুরুতর অভিযোগও ওঠে এই কার্যালয়ের বিরুদ্ধে।

বিভাগীয় তদন্তের দাবি ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ে স্বস্তি

বিতর্কিত সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে ওএসডি করে মহাখালীতে বদলির খবর ছড়িয়ে পড়তেই চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও সাধারণ চিকিৎসকদের মাঝে এক ধরনের স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য খাতের একাধিক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কেবল ওএসডি বা বদলিই কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

চট্টগ্রাম সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) এক প্রতিনিধি জানান, "নিয়োগ পরীক্ষার নামে পরীক্ষার্থীদের থেকে নেওয়া কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন এবং ওএমআর জালিয়াতির ঘটনাটির নিরপেক্ষ ও সুনির্দিষ্ট বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন। যদি তদন্ত ছাড়া কেবল ওএসডি করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়, তবে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির লাগাম টানা কখনোই সম্ভব হবে না।"

এদিকে নতুন সিভিল সার্জন হিসেবে মনোনীত ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমানের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কালিমালিপ্ত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা, স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং ক্লিনিক-হাসপাতাল খাতের চরম নৈরাজ্য দূর করা। ২৪ আগস্ট নতুন সিভিল সার্জন দায়িত্ব গ্রহণের পরই দৃশ্যপট কতটা বদলায়, সেদিকেই এখন নজর চট্টগ্রামবাসীর।

এমএম