সোমবার (১৭ আগস্ট) পতেঙ্গা এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি শাওনের বলে শনাক্ত করেন।
শাওন নগরের হালিশহরের চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের সঙ্গে সে চুনা ফ্যাক্টরি এলাকায় বসবাস করত। তাদের গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপ উপজেলায়।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (১৫ আগস্ট) শাওনের স্কুলে পরীক্ষা ছিল। দুই ঘণ্টার পরীক্ষায় এক ঘণ্টা পরই খাতা জমা দিয়ে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে যায় সে। পরীক্ষা শেষে সাধারণত এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে বাড়ি ফিরত শাওন। কিন্তু সেদিন বিকেল গড়িয়ে গেলেও সে বাড়ি ফেরেনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিকেল ৩টার পর থেকে শাওনের মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তারা। শাওনের বাবা মাহবুবুর রহমান বলেন, ছেলে একটু দেরি করলেও সাধারণত ফোন করে জানাত। কিন্তু সেদিন বিকেল ৩টার পর থেকে তার কোনো ফোন পাওয়া যায়নি। ছেলের মা-ও বারবার তাকে শাওনকে খুঁজে দেখতে বলছিলেন।
ছেলের খোঁজে প্রথমে শাওনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইদকানের বাসায় যান তার বাবা। সেখানে শাওনের বিষয়ে কোনো তথ্য না পেয়ে ইদকানের বাবার সহপাঠী ও হালিশহর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জিহাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি।
পরিবারের দাবি, ওই রাত সাড়ে ১০টার দিকে শাওনের কয়েকজন বন্ধুকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তখন তারা শাওন সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী তথ্য দেয়। প্রথমে তারা জানায়, সবাই একসঙ্গে পতেঙ্গা থেকে ফিরে শাওনকে বি-ব্লক ব্রিজের পাশে নামিয়ে দিয়েছে। পরে সাব্বির নামের আরেক বন্ধুও একই ধরনের বক্তব্য দেয়।
তবে ওই বক্তব্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও শাওনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে ওই রাতেই হালিশহর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পরিবার।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে শাওনের বন্ধুদের বক্তব্য থেকে ঘটনার বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়া যায়। তাদের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পরিবার জানায়, শাওনসহ কয়েকজন বন্ধু সেদিন সাগরের পানিতে নেমেছিল। একপর্যায়ে ঢেউয়ের তোড়ে শাওন পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করে।
বন্ধুরা তাকে ধরে ওপরে তোলার চেষ্টা করেছিল বলে তাদের বক্তব্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা শাওনকে উদ্ধার করতে পারেনি। পরে শাওন সাগরের পানিতে ভেসে যায় বলে পরিবারের কাছে জানানো হয়।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর শাওনের বন্ধুরা বিষয়টি তাদের বা পুলিশকে জানায়নি। এমনকি শাওনের স্কুলব্যাগও সাগরে ফেলে দিয়ে তারা বাড়ি ফিরে যায়। আইনি ঝামেলা এড়ানোর জন্যই তারা ঘটনাটি গোপন রেখেছিল বলে পরিবারের দাবি।
এদিকে, নিখোঁজের তিন দিন পর সোমবার পতেঙ্গা থানা-পুলিশ একটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহটির পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় তা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
পরে বিষয়টি জানতে পেরে পরিবারের সদস্যরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে যান। সেখানে মরদেহ দেখে তারা সেটি শাওনের বলে শনাক্ত করেন। পরে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়।
ময়নাতদন্ত শেষে শাওনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তার মৃত্যু কীভাবে হয়েছে এবং বন্ধুদের ভূমিকা কী ছিল, তা তদন্ত করছে পুলিশ।
এ ঘটনায় শাওনের চার বন্ধুকে আসামি করে হালিশহর থানায় মামলা করেছে তার পরিবার। মামলার পর চারজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ বলছে, মামলাটি তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও পুরো ঘটনাপ্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। শাওন পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর বন্ধুরা কেন পরিবার বা পুলিশকে বিষয়টি জানায়নি, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মো. সুলতান আহসান উদ্দিন বলেন, মামলার চার আসামিকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাওনের এমন মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। বন্ধুদের সঙ্গে সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার পর ঠিক কী ঘটেছিল, কেন তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারকে জানানো হয়নি এবং শাওনের মৃত্যুর পর ঘটনাটি গোপন রাখার কারণ কী এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশের তদন্ত ও মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই এসব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর পাওয়া যাবে বলে আশা করছে শাওনের পরিবার।
এমএম