ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এবং সিআইআই সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, সফরটি ফলপ্রসূ করতে একটি শক্তিশালী প্রস্তুতিমূলক দল ইতোমধ্যে রাজধানীতে তাঁদের প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক নানা রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের মধ্যে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের এই ঢাকা সফর দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করছেন বিশ্লেষকেরা।
বন্দর বিধিনিষেধ ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের টানাপোড়েন
গত দুই বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কে বেশ কিছু বাধা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থল ও সমুদ্র বন্দরে আরোপিত বিধিনিষেধ, পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা এবং সীমান্ত অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কিছুটা মন্দাভাব লক্ষ্য করা যায়।
এমন এক জটিল বাস্তবতায় ভারতীয় শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের ঢাকা সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে দুই দেশের বাণিজ্যিক মহল। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই আলোচনার মাধ্যমে অশুল্ক বাধাগুলো দূর করে এবং বন্দর অবকাঠামো আধুনিকায়ন করে বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ে বৈঠক ও আলোচনার রূপরেখা
ঢাকায় অবস্থানকালে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পলিসি মেকার ও সরকারের নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বৈঠকে মিলিত হবেন। তাঁদের সফরসূচি অনুযায়ী, তাঁরা বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেবেন।
এ ছাড়া এফবিসিসিআই এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও প্রতিনিধি দলটির আনুষ্ঠানিক বৈঠক করার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় প্রতিনিধি দলটির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। এফবিসিসিআইয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এই সাক্ষাতের বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, তবে আনুষ্ঠানিক শিডিউল যথাসময়ে জানানো হবে।
সফরে অংশ নেওয়া ভারতের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো
ভারতের উদীয়মান এবং শীর্ষস্থানীয় বিশ্বমানের বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর প্রধান নির্বাহী ও প্রতিনিধিরা এই ঐতিহাসিক সফরে অংশ নিচ্ছেন। প্রতিনিধি দলের তালিকায় রয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বেশ কিছু বহুজাতিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
গোদরেজ ইন্ডাস্ট্রিজ (Godrej Industries)
অরবিন্দ লিমিটেড (Arvind Limited)
ইনফ্রাভিশন ফাউন্ডেশন (Infravision Foundation)
এলএমডব্লিউ গ্লোবাল (LMW Global)
মাহিন্দ্রা গ্রুপ (Mahindra Group)
গোদরেজ কনজিউমার প্রোডাক্টস (Godrej Consumer Products)
লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (Larsen & Toubro)
ফোর্বস মার্শাল (Forbes Marshall)
নুমালিগড় রিফাইনারি (Numaligarh Refinery)
বেক্সিমকো আইওসি পেট্রোলিয়াম (Beximco IOC Petroleum)
অ্যাপোলো হাসপাতাল (Apollo Hospitals)
এসব প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি বাংলাদেশের এনার্জি, ম্যানুফ্যাকচারিং, হেলথকেয়ার, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কৃষি-প্রসেসিং খাতে নতুন যৌথ বাণিজ্যের বার্তা দিচ্ছে।
১২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ও বৈষম্য দূর করার চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যের আকার বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। তবে এই বিশাল অঙ্কের বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের অনুকূলে রয়েছে। ভারত থেকে বাংলাদেশের বড় অঙ্কের আমদানির বিপরীতে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ, দুই দেশের মধ্যে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের দীর্ঘদিনের দাবি—ভারতে পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অশুল্ক ও প্রযুক্তিগত বাধা (Non-Tariff Barriers) অপসারণ করা। সিআইআই-এর প্রতিনিধিরা মনে করছেন, দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। তাই বাজার সম্প্রসারণ, পারস্পরিক সুযোগ উন্মুক্ত করা এবং বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার আরও সহজ করার উদ্যোগ নিলে এই বাণিজ্য বৈষম্য অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাণিজ্যিক অগ্রগতির সম্ভাব্য ক্ষেত্রসমূহ
সিআইআই এবং এফবিসিসিআই-এর সমন্বিত সূত্রে জানা গেছে, এবারের সফরে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র বিশেষ গুরুত্ব পাবে:
১. বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ: প্রথাগত পণ্যের বাইরে গিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রস্তুতকৃত পণ্যের বাজারে পারস্পরিক লেনদেন বৃদ্ধি করা।
২. নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা: ভারতীয় শিল্পগ্রুপগুলো যাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (Special Economic Zones) ভারী শিল্প ও উৎপাদনমুখী কারখানা স্থাপন করতে পারে, সে বিষয়ে বিডার সঙ্গে আলোচনা।
৩. সীমান্ত অবকাঠামো ও লজিস্টিকস: দুই দেশের স্থলবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, ডিজিটাল শুল্কব্যবস্থা চালু করা এবং ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দ্রুত ও সাশ্রয়ী করা।
৪. বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ: অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক ও বিভিন্ন কোয়ারেন্টাইন জটিলতার সমাধান করা।
ব্যবসায়িক খাতের বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করছেন, এই উচ্চপর্যায়ের সফরের মাধ্যমে ঢাকা ও দিল্লির বাণিজ্যিক সম্পর্কে জমে থাকা বরফ গলবে এবং দুই প্রতিবেশী দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে।
এমএম