বুধবার আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আবদুল হাই শিকদার বলেন, ‘জুলাই শুধু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নয়, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও একটি সংগ্রাম ছিল। আমাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদের বিভিন্ন রূপ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা। তাই জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে শুধু একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখার সুযোগ নেই। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সাহস, আত্মমর্যাদা ও দেশপ্রেমের এক অনন্য প্রেরণা।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অটল অবস্থান, সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ও বিজয়ের প্রতীক। জুলাই জাতির সংগ্রামী ইতিহাসের এক অবিনাশী অধ্যায়, যা আগামী প্রজন্মকে ন্যায়, সত্য ও দেশপ্রেমের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে।’
আবদুল হাই শিকদার বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা এবং তরুণ প্রজন্মের অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের ৩৬ দিনের সংগ্রাম কেবল একটি দাবির আন্দোলন ছিল না, এটি ধীরে ধীরে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।’
তিনি জুলাই জাদুঘর উদ্বোধনের উদ্যোগকে প্রশংসনীয় উল্লেখ করে বলেন, ‘এক হাজার বছরেও আবু সাঈদের মতো বীরের জন্ম হয়নি।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি চত্বর থেকে একটি বিজয় র্যালি বের করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আলোচনা সভা, জুলাই স্মৃতিচারণ, জুলাই স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন, তথ্যচিত্র প্রদর্শনী এবং দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে। সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সুশাসন, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ঐক্য সুসংহত করতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও গণসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ চেতনাকে এগিয়ে নিতে হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ হাসমত আলী বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’
তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে দেশপ্রেম, সততা ও নৈতিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে এগিয়ে আসতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিক আহমদ, অনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরী, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কর্নেল মোহাম্মদ কাশেম (অব.), কলা ও মানবিক অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কাউসার আহমেদ এবং প্রক্টর অধ্যাপক মোস্তফা মনির চৌধুরী।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করেন সহযোগী অধ্যাপক সাইফুর রহমান চৌধুরী, স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের সিনিয়র সহকারী পরিচালক আবদুস সেলিম, শিক্ষার্থী জুলেখা আক্তার, রিয়াজুল হক ও শহীদুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোসতাক খন্দকার।
শেষে প্রধান আলোচক আবদুল হাই শিকদারকে সম্মাননা প্রদান, জুলাই স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানভিত্তিক একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে কুরআনিক সায়েন্সেস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. বি. এম. মফিজুর রহমান আল-আযহারীর পরিচালনায় দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।
এমএম