শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৭টায় আঙ্কারা বিমানবন্দর থেকে প্রেসিডেন্ট এরদোগান ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিশেষ উড়োজাহাজটি উড্ডয়ন করে। আঙ্কারা বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানান তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইলমাজসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ এই সফরে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স (যুবরাজ) মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
আলোচনার টেবিলে কী থাকছে?
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক করার কথা রয়েছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে সঙ্গে নিয়ে তিন দিনের সফরে বৃহস্পতিবারই সৌদি আরবে পৌঁছান শাহবাজ।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট দপ্তরের যোগাযোগ পরিচালক বুরহানেত্তিন দুরান জানিয়েছেন, এই সফরে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচ্যসূচি প্রকাশ না করা হলেও মূল মনোযোগ থাকবে ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি’র ওপর।
দুরান বলেন, ‘সফরকালে প্রেসিডেন্ট এরদোগান সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।’
আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাব এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়গুলোই আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। তবে সুনির্দিষ্ট আলোচনার বিষয়ের ক্ষেত্রে আঙ্কারা বেশ গোপনীয়তা বজায় রেখেছে।
হতে যাচ্ছে কি প্রতিরক্ষা চুক্তি?
একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই তিন দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে একটি জোটে সই করতে পারে। এমন জল্পনার মধ্যেই এরদোগানের এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সৌদি সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, শুক্রবার জেদ্দায় এই তিন নেতা একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করতে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, তুরস্কের একটি গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, চুক্তির মৌলিক শর্তগুলোর বিষয়ে ইতিমধ্যেই তিন পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত হলে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ (কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি)-এর সম্প্রসারণ ঘটতে পারে। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, এর যেকোনো এক দেশের ওপর হামলা হলে তা উভয়ের ওপর হামলা বলে গণ্য হবে। নতুন চুক্তির মাধ্যমে তুরস্কও এই ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর অংশ হতে পারে।
তবে তিন দেশের কোনো সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেনি। ফলে এমন সম্ভাবনাও রয়েছে যে, বড় কোনো চুক্তির বদলে এই সফর থেকে হয়তো সাধারণ একটি যৌথ বিবৃতি আসতে পারে।
হঠাৎ এমন উদ্যোগ কেন?
গত ফেব্রুয়ারিতে এরদোগানের সর্বশেষ রিয়াদ সফরের সময়ও তুরস্ক-সৌদি জোট গঠনের একই ধরনের আলোচনা শোনা গিয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
তবে শুক্রবারের এই সফরের সময়টাও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগর দিয়ে নৌযান চলাচল নিরাপদ করতে সৌদি আরব একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগ ঘোষণার ঠিক এক সপ্তাহ পরই এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ ১৪টি দেশ ইতিমধ্যেই এই জোটকে সমর্থন জানিয়েছে।
তাছাড়া, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে কয়েক মাস ধরে চলা অস্থিরতার মধ্যেই এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই সংকটে ইসলামাবাদ নিজেকে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরানও পালটা ব্যবস্থা নিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোসহ গোটা অঞ্চলজুড়ে যেসব সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছে, সেখানে ইরান মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এছাড়া, ওই অঞ্চলের বিভিন্ন হোটেল ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোও ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গেও সৌদি আরবের চরম উত্তেজনা চলছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উভয় পক্ষই পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে ইয়েমেনের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, এপি, আলজাজিরা
এনএইচ