নতুন বেতন কাঠামোয় তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাবেন নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা। ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এতে বেতন বাড়ছে ১৪২ শতাংশ। আর প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে, যা ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি।

নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হয়েছে। তবে বর্ধিত মূল বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর হবে না। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই তিন ধাপে নতুন বেসিক বাস্তবায়ন করা হবে।

তিন ধাপে কার্যকর হবে বাড়তি বেতন

নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেসিকের বাড়তি অংশের ৫০ শতাংশ প্রথম ধাপে, ২৫ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং বাকি ২৫ শতাংশ তৃতীয় ধাপে যুক্ত হবে।

অন্যদিকে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে বাড়তি বেসিকের ৪০ শতাংশ প্রথম ধাপে, ৩০ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ তৃতীয় ধাপে কার্যকর হবে।

২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেসিক বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ বাড়তি ১১ হাজার ৭৫০ টাকার ৫০ শতাংশ বা ৫ হাজার ৮৭৫ টাকা প্রথম ধাপে যোগ হলে বেসিক দাঁড়াবে ১৪ হাজার ১২৫ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে আরও ২ হাজার ৯৩৭ টাকা ৫০ পয়সা যুক্ত হয়ে তা হবে ১৭ হাজার ৬২ টাকা ৫০ পয়সা। তৃতীয় ধাপেও একই পরিমাণ যোগ হয়ে চূড়ান্ত বেসিক হবে ২০ হাজার টাকা।

প্রথম গ্রেডে বর্তমান ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেসিক বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে। বাড়তি ৭৮ হাজার টাকার ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৩১ হাজার ২০০ টাকা প্রথম ধাপে যুক্ত হয়ে বেসিক হবে ১ লাখ ৯ হাজার ২০০ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে ২৩ হাজার ৪০০ টাকা যোগ হলে তা দাঁড়াবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৬০০ টাকা। তৃতীয় ধাপে আরও ২৩ হাজার ৪০০ টাকা যুক্ত হয়ে চূড়ান্ত বেসিক হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

নবম গ্রেডে বর্তমান ২২ হাজার টাকা থেকে বেসিক বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা হবে। তিন ধাপে এই বেতন যথাক্রমে ৩০ হাজার ৮০০, ৩৭ হাজার ৪০০ এবং ৪৪ হাজার টাকায় উন্নীত হবে।

নতুন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালে

চাকরিজীবীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বেসিক তিন ধাপে বাড়লেও বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা নতুন হারে একসঙ্গে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।

অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুলাইয়ে পুরো নতুন বেসিক কার্যকর হওয়ার পরও নতুন হারে সব ভাতার পূর্ণ সুবিধা পেতে চাকরিজীবীদের আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। এতে বেসিকের পাশাপাশি প্রকৃত মাসিক আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।

উদাহরণ হিসেবে, ঢাকায় নতুন নিয়োগ পাওয়া ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর বেসিক ২০ হাজার টাকা হলে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রযোজ্য ভাতা যোগ করে তার মাসিক মোট আয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা বা তার বেশি হতে পারে। আনুমানিক এই অঙ্ক ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা হতে পারে। তবে কর্মস্থল ও প্রাপ্য ভাতার ধরন অনুযায়ী প্রকৃত আয় ভিন্ন হতে পারে।

একইভাবে ১৩তম গ্রেডে নতুন নিয়োগ পাওয়া একজন সহকারী শিক্ষকের বেসিক ২৪ হাজার টাকা হলে প্রযোজ্য সব ভাতা যুক্ত হওয়ার পর মাসিক মোট আয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা হতে পারে। ১০ম গ্রেডে ৩২ হাজার টাকা বেসিকের সঙ্গে ভাতা যোগ হলে মোট আয় ৫০ হাজার টাকার বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নবম গ্রেডের একজন নতুন কর্মকর্তার বেসিক হবে ৪৪ হাজার টাকা। ঢাকায় ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া হিসেবে আরও ২২ হাজার টাকা যোগ হলে শুধু বেসিক ও বাড়িভাড়া মিলিয়ে দাঁড়াবে ৬৬ হাজার টাকা। চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য ভাতা যুক্ত হলে মোট মাসিক আয় প্রায় ৭০ হাজার টাকা হতে পারে।

তবে বর্তমানে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে নতুন বেতন নির্ধারণের হিসাব তুলনামূলকভাবে জটিল হবে। তাদের বর্তমান বেসিক, ইনক্রিমেন্ট, চাকরির মেয়াদ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন নির্ধারণ করা হবে।

অতিরিক্ত ব্যয় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে। বেতন, ভাতা ও পেনশনসহ নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগী মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ এই সুবিধার আওতায় আসবেন।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, একসঙ্গে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ পড়ত। তাই রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের বাজেট সক্ষমতার বিষয়গুলো বিবেচনা করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তার ভাষ্য, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য বজায় রেখেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদও কয়েক ধাপে বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন। তার মতে, একবারে বড় ধরনের আর্থিক চাপ না দিয়ে ধাপে ধাপে বেতন বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি থাকবে।

তিনি বলেন, বেতন-ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ শুধু পরিচালন ব্যয় বাড়তে থাকলে উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

এনএইচ