কসোভোর রাজধানী প্রিস্টিনায় আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে কসোভোর শিল্প, উদ্যোক্তা, বাণিজ্য ও উদ্ভাবনমন্ত্রী মিমোজা কুসারি-লিলা এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের অগ্রাধিকার খাতসমূহ

বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বর্তমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক পর্যালোচনার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। আলোচনায় উঠে আসা উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:

ওষুধ শিল্প ও বায়োটেকনোলজি: বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের আন্তর্জাতিক সুনাম কাজে লাগিয়ে কসোভোর বাজারে যৌথ উদ্যোগ ও রপ্তানির সম্ভাবনা।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি): বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল আইটি খাত এবং কসোভোর প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সমন্বয়।

ঐতিহ্যবাহী ও তৈরি পণ্য: প্রিস্টিনার বাজারে বাংলাদেশের বিশ্বমানের তৈরি পোশাক (আরএমজি), পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত পণ্য এবং নান্দনিক সিরামিক সামগ্রীর প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি মো. নজরুল ইসলাম কসোভোর বাজারে এসব উচ্চমানের বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত ও সুবিধাভিত্তিক রপ্তানি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সাথে তিনি বাংলাদেশে বর্তমানে বিরাজমান বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপিত ১০০টি ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’-এ কসোভোর শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সরাসরি বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।

যৌথ উদ্যোগ ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সুপারিশ

বাণিজ্য আলোচনাকে কেবল কূটনৈতিক টেবিলে সীমাবদ্ধ না রেখে তা বাস্তবে রূপ দিতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা উঠে এসেছে এ বৈঠকে:

যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউসি) গঠন: দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সংক্রান্ত বাধা দূর করা এবং সম্ভাবনাময় খাতগুলো নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা।

চেম্বারগুলোর মধ্যে সমঝোতা: প্রাক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক মজবুত করতে 'কসোভো চেম্বার অব কমার্স' (ওএইচকে) এবং বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় 'ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি' (ডিসিসিআই)-র মধ্যে সরাসরি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা।

ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সফর: কসোভোর বেসরকারি খাতের একটি বিশেষ অনুসন্ধানী দলকে খুব শীঘ্রই বাংলাদেশ সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে।

কসোভোতে কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা:

যৌথ বৈঠকে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো কসোভোতে নিজস্ব উৎপাদন কার্যক্রম (ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট) গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করে, যা ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের সরাসরি উপস্থিতি তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

বলকান অঞ্চল ও ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশাধিকার

কসোভোর শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী মিমোজা কুসারি-লিলা বাংলাদেশকে একটি গতিশীল অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করেন। বিনিয়োগের সুবিধা তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ভৌগোলিক সন্নিকটে অবস্থান, অনুকূল ও সহনশীল রাজস্ব নীতি, তুলনামূলকভাবে কম খরচে দক্ষ শ্রমশক্তি এবং সিইএফটিএ ও ইএফটিএ-র সাথে যুক্ত থাকার কারণে কসোভো বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের অন্যতম সেরা প্রবেশদ্বার বা 'গেটওয়ে' হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, পশ্চিম বলকান অঞ্চলের দেশগুলোর কৌশলগত আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা ইউরোপীয় বাজারে নিজেদের পণ্য পৌঁছানো আরও সহজ ও সাশ্রয়ী করতে পারেন।

এফটিএ প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ ভাবধারা

বৈঠকের অন্যতম প্রধান সাফল্য ছিল দুই দেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া ও খসড়া নিয়ে আলোচনা শুরু করা। উভয় পক্ষই আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, দ্বিপক্ষীয় এফটিএ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তা কেবল শুল্কসংক্রান্ত জটিলতাই কমাবে না, বরং দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজস্ব ও বিনিয়োগের অভূতপূর্ব পথ উন্মোচন করবে।

বাংলাদেশের উদীয়মান উৎপাদন সক্ষমতা এবং কসোভোর কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান ও চুক্তিগত সুবিধার সংযোগ নতুন এক বৈশ্বিক বাণিজ্যিক সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে।

এমএম