বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত ও সেবাইতদের মধ্যে সম্মানি বিতরণ উপলক্ষে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধি, ধর্মীয় গুরু, বিশিষ্ট নাগরিক এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পুরোহিত ও সেবাইতরা অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মথুরায় শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। সে সময় মথুরার শাসক ছিলেন নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী কংস। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পর কংসের পতন হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন ছিল শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম ব্রত।

তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্র ও সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, মত ও পরিচয়ের মানুষের বসবাস থাকে। এই বৈচিত্র্যই সমাজের সৌন্দর্য।

তারেক রহমান বলেন, সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু- এ ধরনের পরিচয় বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় মুখ্য নয়। কারণ, ইউরোপ বা আমেরিকায় গেলে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সবাইকেই অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তিনি বলেন, ‘সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু নয়, আসুন সবাই নিজেদের বাংলাদেশি ভাবি।’

রাষ্ট্র ও সমাজে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ বা পরিচয় যেন বিভেদ ও বৈষম্যের কারণ না হয়- এই উপলব্ধি থেকেই দেশের নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের গর্বিত পরিচয়- আমরা বাংলাদেশি।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সঙ্গে নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করে আসছেন। তবে বিভিন্ন সময়ে ‘কংস চরিত্রের’ কিছু মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজে বিভেদ-বিরোধ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, সমাজবিরোধী অপশক্তি যাতে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং কেউ যাতে বিদ্যমান সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।

জন্মাষ্টমী উপলক্ষে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্য আরও জোরদার করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

দেশকে অস্থিতিশীল করতে গুজব ছড়ানো হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কেউ কেউ মানুষকে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করছে। কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি বা বিদ্বেষ যাতে সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের অঙ্গীকারের কথাও জানান।

তারেক রহমান বলেন, সার্বভৌমত্ব অটুট রেখে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি। এ লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের সম্মানি ভাতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

তিনি বলেন, সরকার এমন একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে রাষ্ট্র তার সক্ষমতা অনুযায়ী দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। একই সঙ্গে নাগরিকরাও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করবেন।

অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও নৃ-গোষ্ঠি বিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন, সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, স্বামীবাগ ইসকনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী মহারাজ এবং বিএনপির সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ-উর রহমান, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম ডোনার, সহসভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু, গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরীসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা।

এনএইচ