শুক্রবার গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে এনসিপি আয়োজিত গণসমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে নাহিদ ইসলাম সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনা করার পাশাপাশি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কার এবং ভারতের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়েও দলের অবস্থান তুলে ধরেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি দেশের পরিবর্তন ও সংস্কারের লক্ষ্যে গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়াতেও অংশ নেয়।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, তাঁর দল জনগণকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে দেশের প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথ তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা থেকেই দলটি এ অবস্থান নিয়েছিল। এখন সেই রায়ের বাস্তবায়ন না হলে জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করা হবে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বর্তমান সরকারকে ‘প্রতারক’ ও ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান, আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার এবং দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সরকার বিশ্বাসঘাতকতা করছে।
তাঁর বক্তব্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। নাহিদ ইসলাম বলেন, “মাত্র পাঁচ মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে লোডশেডিংয়ের সব রেকর্ড ভেঙেছে সরকার।” এ প্রসঙ্গে তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সময়ের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেন।
তবে লোডশেডিংয়ের ‘সব রেকর্ড’ ভেঙে যাওয়ার দাবিটি নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে এসেছে; সমাবেশে তিনি এ দাবির পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান বা বিদ্যুৎ খাতের তথ্য তুলে ধরেছেন কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে তাঁর বক্তব্যকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি, উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা—এসব বিষয় লোডশেডিংয়ের মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তথ্য ও দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন-সরবরাহের পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ।
সমাবেশে ভারতের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়েও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর দেশের জনগণ মেনে নেবে না। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনগণের মতামতের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
নাহিদ ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, যাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে নির্বাচন করা হয়েছিল, এখন তাদের হাতেই দেশের সম্পদ তুলে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর বক্তব্যে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়গুলোও উঠে আসে।
এনসিপির আহ্বায়কের বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগ এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সমালোচনা। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়েও তিনি দলের কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছেন।
এর আগে জুলাই মাসেও নাহিদ ইসলাম গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের প্রতি কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, গণভোটের রায়ের আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে তাঁর দল কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে যেতে পারে।
শুক্রবারের সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নাহিদ ইসলাম আবারও স্পষ্ট করেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নকে তাঁর দল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং নিয়ে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোরও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
এদিকে নাহিদ ইসলামের এসব বক্তব্যের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে তাঁর অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরকারের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই সনদের সংস্কার প্রক্রিয়া, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক—এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এনসিপি এসব ইস্যুতে আরও কঠোর কর্মসূচি নেয় কি না, সেটিও আগামী দিনে রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠতে পারে।
এমএম