বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তি অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। যা গত মার্চ ২০২৬’র পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে শ্রেণীকৃত ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে মোট ঋণের বিপরীতে শ্রেণীকৃত ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে উঠেছে। যা ব্যাংক খাতের মোট ঋণস্থিতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন শ্রেণীকৃত ঋণের আওতায়। এটি ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং ঋণ আদায় সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তিন মাসে বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে ব্যাংক খাতে শ্রেণীকৃত ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। তিন মাসে বৃদ্ধির পরিমাণ : ৬,০৬,৫৫৫ - ৫,৮৮,৭০৪ = ১৭,৮৫১ কোটি টাকা। শ্রেণীকৃত ঋণের অনুপাতও একই সময়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের শ্রেণীকৃত ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি উঠেছিল। ফলে জুনের ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা সর্বকালের সর্বোচ্চ নয়, তবে এটি আবারও ৬ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করায় ব্যাংক খাতের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এক বছরে পরিস্থিতির বড়ো অবনতি
২০২৫ সালের মার্চে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ছিল ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছায়। একই সময়ে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মার্চ ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে ব্যাংক খাতের মোট ঋণস্থিতি ছিল প্রায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা এবং শ্রেণীকৃত ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
জুনে মোট ঋণস্থিতি ১৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং শ্রেণীকৃত ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। যা বাস্তবে মোট ঋণের বিপরীতে হার; জুন ২০২৪ ২,১১,৩৯১ কোটি টাকা বা ১৩.১১ শতাংশ, জুন ২০২৫-এ ছিলো ৫,৩০,৪২৮ কোটি টাকা বা ৩০.৪০ শতাংশ, মার্চ ২০২৬ এ ছিলো ৫,৮৮,৭০৪ কোটি টাকা ৩২.২৬ শতাংশ, জুন ২০২৬ এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৬,০৬,৫৫৫ কোটি টাকা ৩২.৭৮ শতাংশ।
কেন বাড়ছে খেলাপি ঋণ?
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে বলে ব্যাংকার ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল ঋণ আদায়, দীর্ঘদিনের অনাদায়ি ঋণের পুনঃশ্রেণীকরণ, কিছু ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির একটি কারণ ছিল বিদ্যমান খেলাপি ঋণের ওপর জমা হওয়া অনাদায়ি সুদ। একই সঙ্গে ঋণ আদায়ের ধীরগতিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধা কতটা কার্যকর?
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময়ে ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল সাময়িকী সংকটে পড়া, কিন্তু সম্ভাবনাময় ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখা এবং ব্যাংকের পাওনা অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করা।
কিন্তু একই ঋণ বারবার পুনঃতফশিলের পর আবার খেলাপি হলে নীতিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফলে ভবিষ্যতে প্রকৃত ব্যাবসায়িক সংকটে পড়া ঋণগ্রহীতা এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও ঋণ আদায় ও ব্যাংক খাতের সুশাসন জোরদারে আরও কঠোর পদক্ষেপের দিকে যাচ্ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সবচেয়ে বেশি চাপ রাষ্ট্রায়ত্ত ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর দেওয়া মার্চ ২০২৬’র তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শ্রেণীকৃত ঋণের অনুপাত ছিল ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তা ছিল ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর শ্রেণীকৃত ঋণের হার ছিল ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ। এই পার্থক্য দেখায়, পুরো ব্যাংক খাতের সংকট একরকম নয়। কিছু ব্যাংকের সম্পদের মান ও ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।
খেলাপি ঋণের অর্থনীতিতে প্রভাব
খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে ব্যাংকের ঋণ আদায় থেকে প্রত্যাশিত নগদ প্রবাহ কমে যায়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যাংককেও প্রভিশন রাখতে হয়। এর ফলে মুনাফা, মূলধন এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
ব্যাংক খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছানো তবু শুধু ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে বিনিয়োগ, ঋণের ব্যয়, ব্যাবসায়িক আস্থা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সম্পদের মান, মূলধন পর্যাপ্ততা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে এ কারণেই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি যে, খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ মানে এই নয় যে, ব্যাংকের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ নিশ্চিতভাবে ‘আদায়-অযোগ্য’। শ্রেণীকৃত ঋণ এবং সম্পূর্ণ আদায়-অযোগ্য ঋণ এক বিষয় নয়। শ্রেণীকৃত ঋণের বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে এবং সব শ্রেণীকৃত ঋণের অর্থ যে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে, তা বলা যায় না। তাই ‘প্রতি ১০০ টাকায় ৩৩ টাকা আদায়-অযোগ্য’ বলার পরিবর্তে সঠিক সংবাদ ভাষা হবে- “ব্যাংক খাতের প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩২ টাকা ৭৮ পয়সা শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণের আওতায় রয়েছে।”
এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে, খেলাপি ঋণের সংকট মোকাবিলায় শুধু পুনঃতফসিল বা নতুন সুবিধা দেওয়া যথেষ্ট নয়। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি, প্রকৃত ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা যাচাই, দ্রুত ঋণ আদায় এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তারা চারটি ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন। ইচ্ছাকৃত খেলাপি শনাক্ত করা : প্রকৃত ব্যাবসায়িক ক্ষতিজনক ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। ঋণ অনুমোদনে জবাবদিহি : অনিয়ম বা দুর্বল যাচাইয়ের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ করতে হবে। পুনঃতফসিলে কঠোরতা : একই ঋণ বারবার পুনঃতফশিলের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তব ব্যাবসায়িক সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। দ্রুত আদায় ব্যবস্থা : ঋণ আদায়সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।
চ্যালেঞ্জ :
৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকার শ্রেণীকৃত ঋণ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য বড়ো সতর্কসংকেত। তিন মাসে আরও ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা যোগ হওয়া দেখাচ্ছে যে, ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে এখনও কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি।
এখন মূল প্রশ্ন হলো-নীতিগত সুবিধা দিয়ে কতটা ঋণ পুনরুদ্ধার করা যাচ্ছে এবং কতটা ঋণ কেবল ভবিষ্যতের জন্য ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?
ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য তাই নতুন সুবিধার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে স্বচ্ছতা, সুশাসন, ঋণ অনুমোদনে জবাবদিহি এবং দ্রুত আদায় ব্যবস্থা। ৬ লাখ কোটি টাকার ওপরে ওঠা খেলাপি ঋণ সেই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
এমএম