বাংলাদেশও সেই পরিবর্তনের বাইরে থাকতে চাইছে না। বরং সরকারের জনপ্রশাসনসংক্রান্ত নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এআইকে প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
এআই ও সুশাসনবিষয়ক এক সেমিনারে জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জাবিউল্লাহ-এর মতে, নির্বাচনি ইশতাহারে সামগ্রিক প্রশাসন ও শাসনব্যবস্থায় এআই প্রযুক্তি প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তঃমন্ত্রণালয়ভিত্তিক একটি ইন্টার-অপারে বল এআই ফ্রেমওয়ার্ক সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তাঁর বক্তব্যে শুধু প্রযুক্তির সম্ভাবনা নয়, উঠে এসেছে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নও এআই কি মানুষের চাকরি কমিয়ে দেবে? নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কতটা নিরাপদ থাকবে? বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদার এ প্রযুক্তি বাংলাদেশ কতটা সামলাতে পারবে? আর সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন-প্রযুক্তি কি মানুষকে সহায়তা করবে, নাকি একসময় মানুষকেই অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এখন সময় এসেছে বাংলাদেশের এআই যাত্রাকে নতুন করে দেখার।
বাংলাদেশের সরকারি অফিসে ফাইলের দীর্ঘসূত্রতা নতুন কোনো বিষয় নয়। একটি সিদ্ধান্ত নিতে কখনো একাধিক দপ্তর, কর্মকর্তা ও নথির ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পেতে সময় লাগে, পুরোনো প্রজ্ঞাপন বা পরিপত্র খুঁজতে হয়, আবার একই তথ্য বিভিন্ন দপ্তরে আলাদাভাবে সংরক্ষিত থাকে। এখানেই এআই বড়ো পরিবর্তন আনতে পারে।
একজন কর্মকর্তা যদি অনুমোদিত সরকারি ডেটাবেজে থাকা আইন, বিধিমালা, পরিপত্র, পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত ও নথি থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে যান, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
জনপ্রশাসন উপদেষ্টার বক্তব্যেও এমন একটি এআই সহকারীর ধারণা উঠে এসেছে, যা সরকারের অনুমোদিত জ্ঞানভাণ্ডার থেকে তথ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট আইন, সার্কুলার ও পূর্বদৃষ্টান্তসহ উত্তর দিতে পারবে।
জনগণের জন্য এআইয়ের হতে পারে-একটি সরকারি সেবা পেতে কম সময়, কম দৌড়ঝাঁপ এবং কম হয়রানি। পাসপোর্ট, লাইসেন্স থেকে কর-বদলে যেতে পারে সেবার ধরন এআইয়ের সবচেয়ে বড়ো সম্ভাবনা সম্ভবত নাগরিক সেবায়।
পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, কর প্রদান, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, সরকারি অনুমোদন কিংবা বিভিন্ন সনদ- এসব সেবায় তথ্য যাচাই ও সিদ্ধান্তের সহায়ক হিসেবে এআই ব্যবহার করা গেলে মানুষের অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন অনেক কমে যেতে পারে।
একজন নাগরিককে যদি নিজের আবেদনের অবস্থা জানতে দিনের পর দিন কোনো কর্মকর্তার কক্ষে অপেক্ষা করতে না হয়, বরং একটি ডিজিটাল সিস্টেম তাৎক্ষণিক উত্তর দিতে পারে, তাহলে সেটিই হবে প্রযুক্তির সবচেয়ে বড়ো সাফল্য।
অর্থাৎ এআইয়ের আসল মূল্য শুধু ‘স্মার্ট’ প্রযুক্তিতে নয়, এর মূল্য হবে সাধারণ মানুষের সময় ও ভোগান্তি কমাতে পারার মধ্যে। সরকারি প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্র বিশ্লেষণ, বাজারমূল্যের সঙ্গে তুলনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণেও এআই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন বা অর্থ বিভাগ যদি বিপুলসংখ্যক প্রকল্পের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারে, তাহলে অস্বাভাবিক ব্যয়, সময়ের বিচ্যুতি বা সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এর ফলে সরকারি অর্থের অপচয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে-এআই যে তথ্যের ওপর কাজ করবে, সেই তথ্য সঠিক হতে হবে। ভুল ডেটা দিয়ে উন্নত এআই ব্যবহার করলেও ফলাফল ভুল হতে পারে।
এআইয়ের সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা : কর্মসংস্থান
এআই একজন মানুষকে দিয়ে এমন কাজ করিয়ে দিতে পারে, যা আগে দুই, পাঁচ বা দশজন মানুষ মিলে করতেন। ফলে একই কাজ কম সময়ে এবং কম খরচে করা সম্ভব হবে। কিন্তু এর বিপরীত দিকও রয়েছে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে কর্মসংস্থান শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত। প্রশ্ন হলো-প্রশাসনে এআই ব্যবহার করে যদি মানুষের প্রয়োজন কমে যায়, সেই মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ কী? এ কারণেই ‘মানবহীন সরকার’ নয়, বরং ‘এআই-সহায়ক সরকার’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ।
এআই মানুষের জায়গা পুরোপুরি দখল করবে-এমন ব্যবস্থার বদলে এমন একটি মডেল প্রয়োজন, যেখানে এআই হবে কর্মকর্তার সহকারী, আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায়িত্ব থাকবে মানুষের হাতে। তথ্যই হবে নতুন সম্পদ, আবার সবচেয়ে বড়ো ঝুঁকিও এআই ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ডেটা বা উপাত্ত।
সরকারের কাছে নাগরিকদের পরিচয়, ঠিকানা, আয়, সম্পদ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভ্রমণ ও বিভিন্ন সেবার তথ্য থাকে। এই বিপুল তথ্য এআইকে আরও কার্যকর করতে পারে।
কিন্তু একই কারণে এর অপব্যবহার হলে ক্ষতির মাত্রাও হবে বিশাল। কোন তথ্য এআইকে দেওয়া যাবে, কোন তথ্য গোপন থাকবে, নাগরিকের সম্মতি কোথায় প্রয়োজন, তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হবে এবং কে সেই তথ্য ব্যবহার করতে পারবে-এসব প্রশ্নের উত্তর নীতিমালায় স্পষ্ট থাকতে হবে।
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ : এআই যত শক্তিশালী হবে, ডেটা সুরক্ষার প্রয়োজনও তত বাড়বে। বিদ্যুতের প্রশ্নও উপেক্ষা করা যাবে না এআই নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আরেকটি বিষয় প্রায়ই আড়ালে চলে যায়-বিদ্যুৎ।
বড়ো এআই মডেল পরিচালনা ও ডেটা সেন্টার চালাতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত যখন নিজেরাই চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য নিয়ে কাজ করছে, তখন বড়ো পরিসরে এআই অবকাঠামো তৈরির আগে শক্তি কৌশলও নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ এআই নীতি আলাদা কোনো প্রযুক্তি নীতি নয়, এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, শিক্ষা, অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা ও শিল্পনীতিও যুক্ত। বিশ্বের বড়ো অর্থনীতিগুলো ইতোমধ্যে এআইকে জাতীয় সক্ষমতার অংশ হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এক্ষেত্রে বড়ো প্রতিদ্বন্দ্বী। ইউরোপও নিজস্ব নীতি ও সক্ষমতা তৈরিতে কাজ করছে।
ইসরায়েলের উদাহরণও আলোচনায় এসেছে। সেখানে প্রযুক্তি, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগের মধ্যে সমন্বয় এআইভিত্তিক একটি শক্তিশালী পরিবেশ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো-শুধু মেধাবী মানুষ থাকলেই হবে না। সেই মেধাকে গবেষণায়, গবেষণাকে প্রযুক্তিতে এবং প্রযুক্তিকে অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতায় রূপান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে তিনটি জরুরি কাজ
বাংলাদেশের এআই যাত্রাকে বাস্তবসম্মত করতে অন্তত তিনটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, দ্রুত একটি কার্যকর ও বাস্তবমুখী জাতীয় এআই নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি তথ্যের শ্রেণীকরণ ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, মানুষকে এআই যুগের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।
প্রশিক্ষণ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে এআই তুলে দিলে প্রযুক্তি ব্যবহারের বদলে নতুন ধরনের ভুল তৈরি হতে পারে। সাধারণ মানুষের জন্য এআই কেমন হবে?
এআই নিয়ে বড়ো বড়ো আলোচনা সাধারণ মানুষের কাছে তখনই অর্থবহ হবে, যখন তারা এর সুফল নিজের জীবনে দেখতে পাবেন।
একজন কৃষক যদি দ্রুত সরকারি সহায়তার তথ্য পান, একজন রোগী যদি স্বাস্থ্যসেবার সঠিক দিকনির্দেশনা পান, একজন শিক্ষার্থী যদি মানসম্মত শিক্ষাসামগ্রী পান, একজন ব্যবসায়ী যদি কর বা লাইসেন্সসংক্রান্ত তথ্য তাৎক্ষণিক পান, কিংবা একজন নাগরিক যদি সরকারি অফিসে না গিয়েই নিজের আবেদনের সমাধান পান-তখনই এআই সত্যিকারের জনবান্ধব প্রযুক্তি হয়ে উঠবে। এআইকে একটি দেশলাই কাঠির সঙ্গে তুলনা করা যায়। একই কাঠি দিয়ে রান্না করা সম্ভব, আবার অসতর্ক হলে আগুনও লাগতে পারে।
তাই বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্ন, এআই ব্যবহার করবে কি না-তা নয়? প্রশ্ন হলো : কীভাবে, কোথায়, কতটা এবং কোন নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে এআই ব্যবহার করা হবে? জনপ্রশাসনে এআই মানুষের বিকল্প নয়, মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর হাতিয়ার হওয়া উচিত। প্রযুক্তি যেন নাগরিককে আরও কাছে টানে, দূরে সরিয়ে না দেয়। সরকারি সেবা যেন দ্রুত হয়, কিন্তু মানবিকতা যেন হারিয়ে না যায়। সবচেয়ে বড়ো কথা, বাংলাদেশের এআই যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষকে।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির সাফল্য কত উন্নত, কত দ্রুত বা কত ব্যয়বহুল-তা দিয়ে মাপা হবে না। মাপা হবে একজন সাধারণ নাগরিকের জীবন কতটা সহজ, কতটা সময় বাঁচল এবং রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা কতটা বাড়ল-সেটি দিয়ে তা সমগ্র ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এআইয়ের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য বড়ো অর্জন হয়ে থাকবে।
এমএম