দুজনের কেউই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় এবার আর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ নেই। ফলে ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ হবে দেশের পরবর্তী সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান। নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, আজ দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে। ভোট শেষ হওয়ার পর সেখানেই ব্যালট গণনা করে ফল ঘোষণা করা হবে।

সংসদে দলীয় সংখ্যার হিসাবে অবশ্য মির্জা ফখরুল অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন। ৩৫০ আসনের সংসদে চট্টগ্রাম-৪ আসন শূন্য থাকায় এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার ৩৪৯ জন। এর মধ্যে বিএনপির সংসদ সদস্য ২৪৭ জন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জনের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও অন্যান্য শরিক দলের সংসদ সদস্যরা অলি আহমদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

সংখ্যার এই ব্যবধানের কারণে মির্জা ফখরুলের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, দুই প্রার্থী থাকায় ভোট গ্রহণ ও গণনার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেই ফল ঘোষণা করতে হবে।

বাংলাদেশে সর্বশেষ সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাসের বিপরীতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছিল সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী না থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। একক প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে।

যেভাবে হবে ভোট

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার কেবল জাতীয় সংসদ সদস্যরা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে সংসদ কক্ষেই ভোটগ্রহণ হবে।

প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি করে ভোট। ভোটাররা নির্ধারিত ব্যালটে প্রার্থীর নামের পাশে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন এবং ব্যালট নির্ধারিত বাক্সে জমা দেবেন। ভোটগ্রহণের জন্য সংসদ কক্ষে তিনটি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ভোট শেষ হওয়ার পর সংসদ কক্ষেই ব্যালট বাক্স খোলা হবে। গণনায় প্রথমে কতজন ভোট দিয়েছেন, কতটি ব্যালট বৈধ ও বাতিল হয়েছে এবং কতটি অব্যবহৃত রয়েছে—তার হিসাব করা হবে। এরপর দুই প্রার্থী কতটি করে বৈধ ভোট পেয়েছেন তা নির্ধারণ করা হবে। সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করবেন নির্বাচনি কর্তা।

ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল জানতে পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। আজ ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরই ফল ঘোষণা করার প্রস্তুতি রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। পরে গেজেট প্রকাশ করা হবে।

গোপন নয়, প্রকাশ্য ভোট

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত বিষয় ভোটের গোপনীয়তা। সাধারণ নির্বাচনের মতো এখানে ভোট গোপন থাকবে না। সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্য ব্যালটে ভোট দেবেন এবং কে কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন তা উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে দৃশ্যমান থাকবে।

সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনও বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হবে ‘ওপেন’ ব্যালটে। ভোটগ্রহণকালে সংসদ কক্ষে কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা, বক্তব্য বা ভাষণ দেওয়া যাবে না।

এ নির্বাচনকে ঘিরে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়েও রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক রয়েছে। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদীয় কার্যক্রমের সাধারণ ভোট নয়, এটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক নির্বাচন। এ কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে রিটও হয়েছে। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে এখন পর্যন্ত কোনো আইনি বাধা নেই।

আগামীকাল শপথ

নির্বাচন শেষে আজই ফল ঘোষণা ও গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি রয়েছে। আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। তবে উত্তরাধিকারী দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকতে পারেন। একই ব্যক্তি একাদিক্রমে হোক বা না হোক, দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতির পদে থাকতে পারেন না।

শূন্য পদ থেকেই নতুন নির্বাচন

২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়। এরপর সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করে নির্বাচন কমিশন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ৬ আগস্ট। তফসিল অনুযায়ী ৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা, ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় নির্ধারিত ছিল। প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হওয়ার পর দুই প্রার্থীই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকায় আজ ভোট হচ্ছে।

রাষ্ট্রপতি হলে সংসদীয় আসন ছাড়তে হবে ফখরুলকে

বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমানে সংসদ সদস্য। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে শপথ নেওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী তার সংসদীয় আসন শূন্য হবে। এরপর ওই আসনে ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন আয়োজন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা হলেও রাষ্ট্রপতির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব। তিনি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন, সংসদ আহ্বান ও অধিবেশন সমাপ্তির ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেন, সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি দেন এবং সংবিধান ও আইনে নির্ধারিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কও রাষ্ট্রপতি।

তিন দশকের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাস

১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের চিত্র বদলে যায়। ওই নির্বাচনে বিএনপি তাদের তৎকালীন স্পিকার আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে প্রার্থী করেছিল। আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি বিরোধী দল তার প্রার্থিতার বিরোধিতা করে সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করেছিল।

এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রপতি করে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। তবে সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির জেরে আট মাসের মাথায় তাকে পদত্যাগ করতে হয়। পরে রাষ্ট্রপতি হন ইয়াজউদ্দিন আহমদ।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি হন জিল্লুর রহমান। তার মৃত্যুর পর মোহাম্মদ আবদুল হামিদ প্রথমে ভারপ্রাপ্ত এবং পরে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হন তিনি। দুই মেয়াদ শেষে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন।

তার পদত্যাগের পর এবার আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি ভোটের মুখোমুখি বাংলাদেশ। ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত এই ভোট তাই কেবল নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকছে।

এনএইচ