গণভোটে মোট ভোট পড়েছে ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩টি। এর মধ্যে বৈধ ভোট ৭ কোটি ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৬টি। বৈধ ভোটের ৬২ দশমিক ০৪ শতাংশ বা ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি পড়েছে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে। বিপরীতে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি বা ২৮ দশমিক ৪১ শতাংশ ভোট পড়েছে ‘না’র পক্ষে। বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি ভোট, যা মোট কাস্টিং ভোটের ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ। সংসদ নির্বাচনে বাতিল ভোটের সংখ্যা যেখানে ১৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৮২টি, সেখানে গণভোটে বাতিলের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি—এটি বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও বরিশাল—এই পাঁচ বিভাগে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। বিএনপি জোটের যে তিন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন, তারাও এ অঞ্চলগুলোর আসন থেকে নির্বাচিত। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ পাঁচ বিভাগেই ভোটার উপস্থিতির হার তুলনামূলক কম ছিল। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে সর্বনিম্ন ভোট পড়েছে ঢাকা-১২ আসনে—মাত্র ৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। বিপরীতে মানিকগঞ্জ-৩ আসনে সর্বোচ্চ ৬৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ ভোট পড়ে এবং সেখানে বিএনপি প্রার্থী জয়ী হন।
সিলেট বিভাগে মৌলভীবাজার-১ আসনে সর্বোচ্চ ৫৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং সুনামগঞ্জ-৩ আসনে সর্বনিম্ন ৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ ভোট পড়ে। দুটি আসনেই বিএনপি প্রার্থী জয়ী হলেও সুনামগঞ্জ-২ আসনে ‘না’ ভোট বেশি পড়েছে—৬৭ হাজার ৪১০ ‘হ্যাঁ’র বিপরীতে ৭০ হাজার ৮২৩ ‘না’। এটি সিলেট অঞ্চলে ভিন্নমতের ইঙ্গিত দেয়।
রংপুর ও খুলনা বিভাগে সংসদ ও গণভোট—উভয় ক্ষেত্রেই ভোটার উপস্থিতির হার ছিল তুলনামূলক বেশি। রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়-১ আসনে সর্বোচ্চ ৭৭ দশমিক ৪০ শতাংশ গণভোট পড়ে, যা দেশব্যাপী অন্যতম সর্বোচ্চ। অন্যদিকে গাইবান্ধা-৫ আসনে সর্বনিম্ন ৫৭ দশমিক ৬০ শতাংশ ভোট পড়ে। খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গা-1 আসনে ৭৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ ভোট পড়ে, আর খুলনা-৩ আসনে পড়ে ৫৯ দশমিক ৮২ শতাংশ।
এই দুই বিভাগে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট শক্ত অবস্থান তৈরি করে। ফলে ভোটার উপস্থিতি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা ছিল তুলনামূলকভাবে তীব্র।
‘না’ ভোটের ১২ আসন: ব্যতিক্রমের মানচিত্র
জাতীয় ফলাফলে ‘হ্যাঁ’ এগিয়ে থাকলেও ১২টি আসনে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে খুলনার ঝিনাইদহ-১, ঢাকার নেত্রকোনা-৪, সিলেটের সুনামগঞ্জ-২, চট্টগ্রামের ৮, ১২ ও ১৩ নম্বর আসন এবং পার্বত্য তিন জেলা—বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি উল্লেখযোগ্য। তবে সবচেয়ে আলোচিত ফল এসেছে গোপালগঞ্জ জেলার তিনটি আসন থেকে।
গোপালগঞ্জ-১, ২ ও ৩—তিন আসনেই ‘না’ ভোট দ্বিগুণের বেশি ব্যবধানে জয়ী হয়েছে। জেলায় মোট ৪ লাখ ৫১ হাজার ৪২৭ জন গণভোটে অংশ নেন। এর মধ্যে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৬ জন ‘না’ এবং ১ লাখ ২২ হাজার ৫১৬ জন ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। গোপালগঞ্জ-১ আসনে ১ লাখ ২৮ হাজার ২৯৮ ‘না’ বনাম ৫৪ হাজার ৭১৬ ‘হ্যাঁ’; গোপালগঞ্জ-২-এ ১ লাখ ৭ হাজার ২৯০ ‘না’ বনাম ৩৪ হাজার ৩০২ ‘হ্যাঁ’; এবং গোপালগঞ্জ-৩-এ ৯৩ হাজার ৩৬৮ ‘না’ বনাম ৩৩ হাজার ৪৯৮ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাতেও ‘না’ জয়ী হয়েছে। বান্দরবানে ৯০ হাজার ১৫৬ ‘না’ বনাম ৭১ হাজার ৪১৭ ‘হ্যাঁ’; রাঙামাটিতে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮০৫ ‘না’ বনাম ৭১ হাজার ৬৯৯ ‘হ্যাঁ’; খাগড়াছড়িতে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪২ ‘না’ বনাম ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৫৫ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে। এই ফলাফল পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক মনোভাবের স্বতন্ত্রতা তুলে ধরে।
বাতিল ভোট: উদ্বেগের কারণ
গণভোটে বাতিল ভোটের সংখ্যা ৭৪ লাখের বেশি—যা সংসদ নির্বাচনের বাতিল ভোটের তুলনায় প্রায় সাড়ে চার গুণ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি হতে পারে ব্যালট পদ্ধতি সম্পর্কে অস্পষ্টতা, ভোটারদের বিভ্রান্তি অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ভোট নষ্ট করার প্রবণতার ফল। এত বিপুল বাতিল ভোট গণভোটের ফলাফলের ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
সামগ্রিকভাবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ শক্ত অবস্থানে থাকলেও আঞ্চলিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক প্রবণতার। যেখানে পাঁচ বিভাগে বিএনপি সংসদ নির্বাচনে আধিপত্য দেখিয়েছে, সেখানে রংপুর ও খুলনায় তুলনামূলক বেশি ভোটার উপস্থিতি প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা বোঝায়। আবার গোপালগঞ্জ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ফলাফল দেখাচ্ছে—জাতীয় প্রবণতার মধ্যেও স্থানীয় বাস্তবতা আলাদা হতে পারে।
এই নির্বাচন তাই শুধু সংখ্যাগত জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; এটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক মনোভাব, ভোটার আচরণ এবং ভবিষ্যৎ কৌশলের দিকনির্দেশনা বহন করছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারপক্ষের জন্য স্বস্তির বার্তা হলেও ১২ আসনে ‘না’র জোরালো উপস্থিতি বিরোধী রাজনীতির সম্ভাব্য পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে যে দ্বিমাত্রিক রায় উঠে এসেছে, তা আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এমএম