এই প্রবণতা শুধু বাকস্বাধীনতার সংকট নয়, বরং গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও সুশাসনের জন্য একটি কাঠামোগত হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য, পক্ষপাতিত্ব কিংবা অতিরঞ্জনের অভিযোগ থাকতেই পারে। তবে এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাবানদের ওপর নজরদারি ও দুর্নীতি প্রকাশে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য। সংবাদমাধ্যম দুর্বল হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ)-এর প্রকাশিত বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকের তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ইকোনমিস্ট জানায়, ২০১৪ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যেসব দেশ এক সময় যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মতো তুলনামূলক মুক্ত সংবাদ পরিবেশে ছিল, সেগুলোর অনেকটাই এখন এমন অবস্থানে নেমে এসেছে, যেখানে সাংবাদিকরা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও হয়রানির মুখে পড়ছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু দেশে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন বা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। সার্বিয়ার উদাহরণ টেনে বলা হয়, সেখানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কাভার করার সময় সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। এক সময় যেসব দেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনীয় ছিল, সেগুলোর অনেক দেশই এখন সার্বিয়ার মতো অবস্থানে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাস কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করছে না; এটি দুর্নীতির বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর একটি মৌলিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিত হয় যে তাদের কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাবে না, তখন ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থনৈতিক লুটপাট আরও বাড়ে।

সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রকল্প ভি-ডেমের প্রায় ৮০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্য ইকোনমিস্ট দেখিয়েছে, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি বৃদ্ধির মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক বা ‘ফিডব্যাক লুপ’ কাজ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনীতিকরা যখন দুর্নীতিতে জড়াতে চায়, তখন তারা প্রথমে সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। সংবাদমাধ্যম যত বেশি নিয়ন্ত্রিত হয়, দুর্নীতির ঝুঁকি তত বাড়ে। আবার দুর্নীতি যত বাড়ে, সমালোচনামূলক সংবাদ ঠেকানোর প্রবণতাও তত তীব্র হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়াটি হঠাৎ ঘটে না। এটি ধীরে ধীরে বিকশিত হয়, ফলে সাধারণ ভোটাররা অনেক সময় পরবর্তী নির্বাচনের আগে বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেন না। বিশেষ করে জনতাবাদী সরকারগুলোর অধীনে এই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ভি-ডেমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যদি কানাডার মতো তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থান থেকে ইন্দোনেশিয়ার মতো দুর্বল অবস্থায় নেমে যায়, তাহলে সেই দেশের দুর্নীতির মাত্রাও আয়ারল্যান্ডের মতো স্বচ্ছ অবস্থা থেকে লাটভিয়ার মতো কম স্বচ্ছ অবস্থায় পৌঁছাতে পারে। এই পরিবর্তন ধাপে ধাপে ঘটে এবং একবার শুরু হলে তা থামানো কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উদ্বেগজনক বিষয় হলো শুধু প্রকাশ্য কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র নয়, বরং নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করা অনেক সরকারও এখন সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতি অনুসরণ করছে। এসব সরকার সরাসরি সংবাদ প্রকাশ নিষিদ্ধ না করে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে ক্ষমতাসীনদের প্রশংসামূলক কণ্ঠস্বর জোরালোভাবে শোনা যায় এবং সমালোচনামূলক কণ্ঠ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমে অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ, রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন নির্দিষ্ট গণমাধ্যমে সীমাবদ্ধ রাখা এবং সরকারি কাজের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মাধ্যমে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কিনে নিয়ে কার্যত সেগুলোকে নিস্ক্রিয় করে দেওয়া।

অন্যদিকে, যেসব গণমাধ্যম অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অনড় অবস্থান ধরে রাখছে, তাদের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এসব গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতে পরোক্ষ নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অনেক দেশে নিয়মিত কর নিরীক্ষা, লাইসেন্স সংক্রান্ত জটিলতা ও হয়রানিমূলক মামলা স্বাধীন সাংবাদিকদের নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

আরএসএফের জরিপ উদ্ধৃত করে দ্য ইকোনমিস্ট জানায়, বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে অন্তত ১৬০টি দেশেই সংবাদমাধ্যম আর্থিকভাবে টিকে থাকার লড়াই করছে। অর্থনৈতিক দুর্বলতা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও সাংবাদিকরা ক্রমেই লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে অনলাইন হয়রানি, হুমকি ও অপমানজনক প্রচারণার মাত্রা উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ৭৫ শতাংশ নারী সাংবাদিক অনলাইনে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৪২ শতাংশ সরাসরি হুমকি বা হয়রানির মুখে পড়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক দেশে জাতীয় নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ বা ‘ভুয়া খবর’ দমনের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে, যা বাস্তবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব আইনের আওতায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার বা মামলার মুখে পড়তে হচ্ছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যমের জন্য যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি সরকারগুলোর জন্য নজরদারির নতুন হাতিয়ারও দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু দেশে বিক্ষোভ বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও সাংবাদিকদের ফোন হ্যাক করে তথ্যসূত্র চিহ্নিত করা হচ্ছে। আবার কোথাও ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি ফাঁস করে ভয় দেখানো হচ্ছে।

প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও উল্লেখ করা হয়েছে। একসময় বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। স্বাধীন আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যমে সহায়তা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো আরও সাহস পাচ্ছে।

দ্য ইকোনমিস্ট প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহি থাকা জরুরি এ কথা সত্য। তবে সাংবাদিকদের কাজ করতে বাধা দিলে সমাজকেই তার মূল্য দিতে হবে। শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম কাঠামো একবার ভেঙে পড়লে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমে গেলে বিশ্ব আরও দুর্নীতিগ্রস্ত হবে এবং শাসনব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

এমএম