শনিবার (২৭ জুন) সকাল ৭টা ১৮ মিনিটে জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিনের উপস্থিতিতে দানবাক্স খোলার কার্যক্রম শুরু হয়। পরে উদ্ধার করা অর্থ বস্তায় ভরে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় নেওয়া হয় এবং সেখানে গণনার কাজ শুরু করা হয়।

দানবাক্স খোলার সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসনা খান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদ, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান মারুফসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, র‍্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

টাকা গণনার কাজে অংশ নিয়েছেন মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য, পাগলা মসজিদ কমপ্লেক্সের মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পার্শ্ববর্তী জামিয়া ইমদাদিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ চার শতাধিক ব্যক্তি। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিপুল পরিমাণ অর্থ গণনায় সারাদিন লেগে যেতে পারে। ফলে সন্ধ্যা কিংবা রাতের আগে চূড়ান্ত হিসাব জানা সম্ভব নাও হতে পারে।

এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর তিন মাস ২৭ দিন পর দানবাক্স খুলে ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। সেই সঙ্গে মিলেছিল বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার। এবার সেই রেকর্ড অতিক্রম হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাগলা মসজিদ সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত প্রতি তিন মাস পরপর দানবাক্স খোলা হলেও এবার বিভিন্ন কারণে ছয় মাস পর তা খোলা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জমা হওয়া দানের কারণে বিদ্যমান ১১টি দানবাক্সের সঙ্গে নতুন করে আরও দুটি বাক্স যুক্ত করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজারো মানুষ মসজিদে এসে দান করেন। অনেকের বিশ্বাস, এখানে দান করলে মনোবাসনা পূরণ হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই সময়ের সঙ্গে দানের পরিমাণও বাড়ছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান বলেন, দানবাক্স খোলা ও অর্থ গণনার পুরো কার্যক্রমে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। দায়িত্ব পালন করছেন ৪০ জন পুলিশ সদস্য, ১০ জন র‍্যাব সদস্য ও ২০ জন আনসার সদস্য। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও সহযোগিতা করছেন। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন বলেন, বর্তমানে পাগলা মসজিদের তহবিলে জমা রয়েছে ১১৪ কোটি ১৩ লাখ ৭ হাজার ৩৫২ টাকা। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনে ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দান গ্রহণের জন্য মসজিদের নিজস্ব ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে। এ পর্যন্ত অনলাইনে ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকা অনুদান এসেছে।

তিনি জানান, পাগলা মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক ইসলামি কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ এগিয়ে চলছে। এ লক্ষ্যে মসজিদ কমপ্লেক্স ও কবরস্থানের মধ্যবর্তী ৫৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ জমি ক্রয় করা হয়েছে। বর্তমানে নান্দনিক নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। একই সঙ্গে মুসল্লিদের সুবিধার্থে একটি আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, মসজিদের তহবিল থেকে কমপ্লেক্সের মাদরাসায় অধ্যয়নরত ১৩০ জন এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীর ভরণপোষণ, ৩৫ জন কর্মচারী ও ১০ জন আনসার সদস্যের বেতন, বিদ্যুৎ বিল এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ব্যয় বহন করা হয়। পাশাপাশি তহবিলের লভ্যাংশ থেকে জেলার অসহায় রোগীদের চিকিৎসা সহায়তাও দেওয়া হয়।

আজকের অর্থ গণনার কাজে জামিয়া ইমদাদিয়া মাদরাসার ৩০০ জন, পাগলা মসজিদ মাদরাসার ১০৬ জন শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, মসজিদের ৩৫ জন কর্মচারী এবং জেলা প্রশাসনের ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নিচ্ছেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি উপকমিটি পুরো কার্যক্রম তদারকি করছে।

জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় আড়াইশ বছর আগে নরসুন্দা নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা একটি টিলায় এক আধ্যাত্মিক সাধকের আস্তানা ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর সেখানে গড়ে ওঠে পাগলা মসজিদ। সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের দান ও মানতের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই মসজিদ। নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণ, রুপা, বৈদেশিক মুদ্রা, এমনকি গবাদিপশুও দান করার নজির রয়েছে।

বর্তমানে পাগলা মসজিদ দেশের অন্যতম আয়সমৃদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। মসজিদের দানের অর্থ দিয়ে মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় ১১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়তলা-বিশিষ্ট আধুনিক ইসলামি কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। নারীদের জন্যও পৃথকভাবে পাঁচ হাজার মুসল্লির নামাজের ব্যবস্থা রাখা হবে।

এস