মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) তোফায়েল আহমেদ জানান, মামলার তদন্ত সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।
পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা হয়। তদন্তে এখন আর কোনো ধোঁয়াশা নেই।
তিনি জানান, মরদেহ উদ্ধারের অভিযান চলাকালীন গোপন সূত্রে দুই সন্দেহভাজনের নাম জানতে পারে পুলিশ। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার প্রায় দেড় ঘণ্টার মধ্যেই মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যরা সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আটক করেন। তাৎক্ষণিকভাবে আলামত সংগ্রহ করায় তদন্তে কোনো আলামত নষ্ট হয়নি বলেও জানান তিনি।
যেভাবে চারজনের মরদেহ উদ্ধার
ডিবি পুলিশ জানায়, নিহতদের স্বজনরা দুই দিন ধরে ফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে গত ২২ আগস্ট রাতে তাদের বাড়িতে যান। বাড়িটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল এবং ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। অনেক ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করেন। এ সময় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ ছাদে, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ ছাদে ওঠার সিঁড়িতে এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ শোবার ঘরের খাটের নিচে পাওয়া যায়।
শ্মশান থেকে গ্রেপ্তার মুগ্ধ
পুলিশ জানায়, মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলের আশপাশে ঘোরাফেরা করছিলেন সিদ্ধার্থ দাস। বিষয়টি বুঝতে পেরে তার বাবা বিনয় দাস তাকে পাশের এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
পরে রাত ৩টার কিছু পর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ বিনয় দাসের কাছে গিয়ে সিদ্ধার্থের অবস্থান জানতে চায়। বাবার ডাকে সিদ্ধার্থ বেরিয়ে এলে তাকে সঙ্গে নিয়ে অপর সন্দেহভাজন মুগ্ধ দাসের সন্ধানে অভিযান চালানো হয়।
সিদ্ধার্থকে সঙ্গে নিয়ে মুগ্ধের বাড়িতে গেলেও সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশ জানতে পারে, মুগ্ধ দখিগঞ্জ শ্মশানে আশ্রয় নিয়েছে। খবর পেয়ে ডিবির একটি দল সেখানে গিয়ে শ্মশানের কেয়ারটেকারের ঘরের সামনে বসে থাকা অবস্থায় তাকে আটক করে।
দখিগঞ্জ শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ মোহন্ত জানান, মুগ্ধ তুঁতবাগানের দিক থেকে এসে দরজায় কড়া নেড়ে পানি চেয়েছিল। তিনি গেট না খুলে প্রথমে জানালা খুলে পরিস্থিতি দেখেন। এর কিছুক্ষণ পরই প্রশাসনের সদস্যরা সেখানে পৌঁছে মুগ্ধকে আটক করে নিয়ে যায়।
জেলগেটে দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ
হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলী, উপপরিদর্শক মমিনুল ইসলাম ও আবু সাঈদ বাবলা কারাগারে গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
এর আগে আসামিদের অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল পুলিশ। তবে আসামিদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি, আসামিপক্ষের লিগ্যাল এইডের আইনজীবীদের ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত থাকা এবং নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে সোমবার বিকেলে রংপুরের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলাম দুই আসামিকে দুই দিন, প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার আশ্বাস
প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) তোফায়েল আহমেদ বলেন, চারজন হত্যার মামলার তদন্ত সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে। তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি নেই।
তিনি বলেন, কোনো ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে মামলার তদন্তে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা যাবে না। পেশাদারিত্বের সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৩ আগস্ট ভোরে রংপুর নগরীর মাছোয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এমএম