পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের ‘শিংরোড রতনীবাড়ী ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা’র শিক্ষক ও কর্মচারীদের জীবন এখন এমনই এক করুণ ও বেতনহীন অপেক্ষায় আটকে আছে। দীর্ঘ এই ২৬ বছরে এমপিওভুক্তির আলো দেখেনি প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে এক শিক্ষক বেতনের মুখ না দেখেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, আরেকজন দীর্ঘ ১৪ বছর বিনাবেতনে সেবা দিয়ে খালি হাতেই অবসরে গেছেন। জীবিকার তাগিদে শিক্ষকতা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন আরও তিনজন।
ইতিহাস ও স্বীকৃতির দীর্ঘ পথপরিক্রমা
১৯৭৩ সালে স্থানীয় দানবীর মজির উদ্দীন সর্দারের দান করা ১ একর ৬৬ শতক জমির ওপর গড়ে উঠেছিল মাদরাসাটির প্রাথমিক ভিত্তি। মাঝে কিছুকাল কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর ২০০০ সালে নতুন উদ্যমে শুরু হয় মাদরাসাটি।
২০০২ সাল: মেলে প্রাথমিক পাঠদানের অনুমতি। ২০০৪ সাল: শিক্ষার্থীরা প্রথম দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয়। ২০০৯ সাল: মিলে একাডেমিক স্বীকৃতি।
বর্তমানে কাগজ-কলমে ৩৮০ জন শিক্ষার্থী এবং ১১ জন শিক্ষক ও ৩ জন কর্মচারী নিয়ে নিয়মিত চলছে মাদরাসাটির কার্যক্রম। শত অভাব-অনটনের মাঝেও শিক্ষার্থীরা ঝুলিতে ভরছে সাফল্যের সুনাম। ২০২৪ সালে দাখিল পরীক্ষায় ৯ জনের মধ্যে ৭ জন, ২০২৫ সালে ১২ জনের মধ্যে ৯ জন এবং ২০২৬ সালে ১৪ জনের মধ্যে ৯ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে।
জীবনের শেষ বয়সেও মেলেনি শ্রমের মূল্য
মাদরাসার ক্বারি শিক্ষক মজিবুর রহমান ২০০১ সালে যোগ দিয়ে ২০০২ সালে পান নিয়োগপত্র। ২০১৫ সালে অবসরে যাওয়া এই শিক্ষক দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এক টাকাও পাননি। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মাদরাসায় সময় দিয়েছি। কোনো বেতন পাইনি, অবসরেও গেলাম খালি হাতে। সংসারে অনেক ক্ষতি হয়েছে। তবে আমার পড়ানো অনেক শিক্ষার্থী আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত এটাই আমার একমাত্র সান্ত্বনা।”
জীবনের শেষদিন পর্যন্ত একটানা সেবা দিয়ে ২০১৯ সালে মারা যান মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার। মৃত্যুর আগে অন্তত একটি মাসের বেতন দেখে যাওয়ার আকুতি থাকলেও, তা অধরাই থেকে গেছে।
সন্তানদের কাছে লজ্জিত শিক্ষকেরা
সংসারের খরচ চালানো, সন্তানদের পড়ালেখার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন এখানকার শিক্ষকেরা।
সিনিয়র মৌলভী শিক্ষক কামাল হোসেন: “২৬ বছর ধরে চরম কষ্টে দিন কাটছে। পরিবার চালানো ও সন্তানদের পড়াশোনা করানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অন্য কোনো ব্যবসা-বাণিজ্যও করতে পারছি না।”
শিক্ষক শহিদুল ইসলাম: “বেতন না থাকায় চার সন্তানের চাহিদা মেটাতে পারি না। পারিবারিক অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন।”
ইবতেদায়ি প্রধান রৌশনারা: “ছেলেকে অনেক কষ্টে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি। অভাব-অনটনের কারণে সন্তানদের জন্য যা করার ইচ্ছা, তার কিছুই করতে পারছি না।”
অফিস সহকারী আনসারুল ইসলাম: “আমরা আজ নিজেদের সন্তানদের কাছেও লজ্জিত। এভাবে মানবেতর জীবনযাপন করা যায় না।”
অবশেষে কি কাটবে এমপিও জট?
একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্বীনি শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার যে শপথ নিয়ে শিক্ষকেরা ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা আজ ২৬ বছরের এক দীর্ঘ ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে।
মাদরাসার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সুপার হাসিবুল ইসলাম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা খুব কষ্টে দিনযাপন করছি। পরীক্ষা ও ফলাফলের দিক থেকে আমরা সবসময় ভালো করে আসছি, কিন্তু এমপিওভুক্তির ভাগ্যোন্নয়ন হয়নি।”
শিক্ষক-কর্মচারীদের এখন একটাই আকুল মিনতি—বর্তমান সরকারের শুভদৃষ্টি যেন পড়ে এই অবহেলিত প্রতিষ্ঠানে। দীর্ঘ আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই 'বিনাবেতনের প্রহর' কাটিয়ে দ্রুততম সময়ে যেন শিংরোড রতনীবাড়ী ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসাটি এমপিওভুক্ত করা হয়।
এমএম
এমএম











