বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের হাজিপাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা জানান মেহেদীর মা মিনু বেগম। মেহেদী হাসান ওই গ্রামের এরশাদুল হকের ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মেহেদী হাসান একজন বাক্‌প্রতিবন্ধী ছিলেন। তবে তিনি অন্যের কথা বুঝতে পারতেন। বয়স্ক বাবার সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় পরিবারের হাল ধরতে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। গত সোমবার রাতে এলাকার কয়েকজন নির্মাণশ্রমিকের সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে বাড়ি থেকে রওনা দেন মেহেদী। মঙ্গলবার সকালে ঢাকার বারিধারায় পৌঁছান তিনি। সেখানে আসরের নামাজ পড়তে বাইরে বের হন। নামাজ শেষে রাস্তার পাশের ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এ সময় দ্রুতগতিতে আসা একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতের ওপর উঠে তাকে চাপা দেয়। পরে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় মেহেদীকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিন ভাই-বোনের মধ্যে মেহেদী ছিলেন ছোট। বড় ভাই বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করেন। আর মেহেদী বাবা-মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতেই থাকতেন। বৃদ্ধ বাবার সামান্য আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো পরিবারটিকে। তার ওপর বাড়ির জরাজীর্ণ ঘরটি নতুন করে তৈরি করা ছিল তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব। পরিবারের হাল ধরতেই নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতে ঢাকায় গিয়েছিলেন মেহেদী। কিন্তু পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আগেই লাশ হয়ে ফিরতে হলো তাকে।

মেহেদীর মা মিনু বেগম বলেন, মাসের শুরু থেকেই ঢাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যেতে চেয়েছিল মেহেদী। কিন্তু খুব রোদ গরম পড়েছে, তাই তাকে যেতে দিইনি। গত সোমবার সে ঢাকায় গেছে। যাওয়ার আগে আমার ছেলে বলেছিল, “মা এবার ঢাকা থেকে ফিরে এসে তোমার জন্য নতুন ঘর করে দেব।” আমার ছেলে ছিল আমার সবকিছু। সে ভালো করে কথা বলতে না পারলেও সবকিছু বুঝত। আমরা গরিব মানুষ, দিন এনে দিন খাই। ভেবেছিলাম ছেলেটা ঢাকায় গিয়ে কিছু আয়-রোজগার করলে আমাদের ভালো চলবে। কিন্তু আমার ছেলেটা মারা গেল। আমার ছেলেকে এভাবে গাড়ি চাপা দিয়ে মারল। আমি এর বিচার চাই।

মেহেদীর মামাতো ভাই সাজ্জাদ চৌধুরী জয় বলেন, মেহেদী হাসান মিম একজন বাক্‌প্রতিবন্ধী। সে কথা বলতে না পারলেও সবকিছু বুঝতে পারত। সে ডোমার সরকারি কলেজে পড়ালেখা করেছে। তার বাবা বৃদ্ধ মানুষ। তেমন আয়-রোজগার করতে পারেন না। যা আয় করেন, তা দিয়ে পরিবারের খরচ চালানো সম্ভব হয় না। মেহেদী আগে এলাকায় কাজ করত। তা দিয়ে কোনোভাবে সংসারে সহযোগিতা করত। এবার এলাকার কয়েকজন নির্মাণশ্রমিকের সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে আসরের নামাজ পড়ে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। এ সময় একটি প্রাইভেট কার তাকে চাপা দেয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়। বুধবার সকালে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এসে দাফন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তারা খুব গরিব মানুষ। পরিবারের কোনো আবাদি জমি নেই। শুধু বাড়ির ভিটাটুকু রয়েছে। পরিবারের হাল ধরতেই মেহেদী ঢাকায় গিয়েছিল। কিন্তু এবার ঢাকায় গিয়ে আর ফিরে এলো না।

এ বিষয়ে ডোমার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) আছগর আলী বলেন, ঢাকায় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এসে দাফন করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বারিধার ডিপ্লোমেটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে থাকা শ্রমিক মেহেদিকে চাপা দেয় একটি প্রাইভেট কার। বেপরোয়াভাবে চালানোর কারণে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতের ওপরে উঠে যায়। এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে গাড়িটির চালক ছিল এক কিশোর। পরে জানা গেছে, কিশোরটির বাবা বাংলাদেশ বিমানের ক্যাপ্টেন। তাদের বাড়ি গুলশানের অভিজাত এলাকায়।

এমএম